দুর্নীতিবাজ ও সিন্ডিকেট চক্রের কাছে যাঁরা আতঙ্কের প্রতীক বা ‘আজরাইল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের চোখে যাঁরা ছিলেন সত্যিকারের ‘সুপারহিরো’—সেই সাহসী ও আপসহীন ম্যাজিস্ট্রেট এবং কর্মকর্তারা আজ কোথায় হারিয়ে গেলেন? ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান, আব্দুল জব্বার মণ্ডল কিংবা সারোয়ার আলমের মতো নামগুলো একসময় শুনলেই দেশের অসাধু চক্র ও রাঘববোয়ালদের মসনদ থরথর করে কেঁপে উঠত। কোনো সিস্টেম বা অজুহাতের তোয়াক্কা না করে তাঁরা কেবল মেরুদণ্ড সোজা রেখে একাই একটা গোটা সিন্ডিকেটকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
অতীতে এই সাহসী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানগুলো দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যুবলীগ নেতা খালেদ বা জি কে শামীমের অবৈধ ক্যাসিনো সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়া, প্রতাপশালী এমপি হাজী সেলিমের দুর্গে হানা দিয়ে এরফান সেলিমকে হাতকড়া পরানো, রিজেন্ট হাসপাতালের সাহেদের ভুয়া করোনা টেস্টের জালিয়াতি উন্মোচন কিংবা আগোরা ও স্বপ্ন-এর মতো বড় বড় চেইনশপের পচা ও ভেজাল পণ্যের সিন্ডিকেট স্পটে ধসিয়ে দেওয়া—সবক্ষেত্রেই অসাধুদের জন্য সাক্ষাৎ যম হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন সারোয়ার আলম।
অন্যদিকে, কাঁচাবাজারে চাল, ডাল ও তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি করা সিন্কেডটের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা ‘মার্কেট ক্রাশার’ খ্যাত আব্দুল জব্বার মণ্ডল স্পটেই দোকান সিলগালা ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করে বাজার মাফিয়াদের কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক তেমনি, বিমানবন্দরে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এবং সাধারণ প্রবাসীদের চরম হয়রানির বিরুদ্ধে একাই ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন ‘ফাটাকেষ্ট’ খ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খান। রানওয়ে থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত চষে বেড়িয়ে ৩০ টাকার জুস ১০০ টাকায় বিক্রি রোধ, টয়লেটে টিস্যুর নামে বাধ্যতামূলক বকশিশ আদায় বন্ধ এবং প্রবাসীদের রক্তপানি করা লাগেজ কেটে মালামাল লুটের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছিলেন নির্মম ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি।
কিন্তু আজ কোথায় সেই গর্জন, কোথায় সেই ঝটিকা অভিযান? যে অফিসারদের প্রতিটি কার্যক্রমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় উঠত এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলত, আজ কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তাঁদের থামিয়ে দেওয়া হলো? কেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল সেই আপসহীন অভিযানগুলো? যারা অন্যায়ের বুকে লাথি মেরে প্রবাসীদের ভিআইপি সম্মান ও অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, আজ কেন তাঁদের সুকৌশলে আড়ালে ঠেলে দেওয়া হলো?—আজকের দিনে এটাই সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় এবং কোটি টাকার প্রশ্ন।