আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এক বড় কৌশলগত অগ্রগতি অর্জিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ডিসেম্বর নির্ধারিত মেয়াদের আগেই দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল গঙ্গা চুক্তি নবায়ন করা হবে বলে জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তির আদলেই এবার একটি কার্যকর, সুষম ও গ্যারান্টিযুক্ত চুক্তি সম্পন্ন হবে, যা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীবাহিত জনপদের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং কৃষির সুরক্ষায় অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করবে।
গত বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত এক মর্যাদাপূর্ণ সেমিনারে প্রধান অতিথির আসনে থেকে তিনি এই আশাব্যঞ্জক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ভবিষ্যৎ পানির পূর্ণভাবনা’ শীর্ষক ওই বিশেষ সেমিনারে দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভূ-রাজনীতি নিয়ে গভীর ও তাত্ত্বিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে দেশের অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, আমাদের এই ভূখণ্ডের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও ভুটানের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে কূটনৈতিক ও সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখেই পানিকূটনীতি পরিচালনা করতে হবে।
বর্তমান সরকারের সুদূরপ্রসারী পানিকূটনীতি এবং দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানিসংকট ও খরার কবল থেকে রক্ষা করতে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে ফিজিওবিলিটি টেস্ট বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল কাজ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এই মহাপরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে তিস্তা অববাহিকার লাখ লাখ কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পাশাপাশি, দেশের জনবহুল দক্ষিণাঞ্চলের পানিবণ্টন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং সুপেয় পানি ও সেচ সুবিধা বহুমাত্রিক উপায়ে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অত্যন্ত দূরদর্শী পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প ইতোমধ্যে একনেক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাস করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাজের গতি সর্বোচ্চ মাত্রায় ত্বরান্বিত করার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী সুনির্দিষ্ট করে জানান যে, আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের এই নির্দিষ্ট তিন মাস সময়ের মধ্যেই পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের দৃশ্যমান কাজ দেশবাসীর সামনে উন্মুক্ত হবে।
সেমিনারে উপস্থিত বিশিষ্ট গবেষক, পানি বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকরা জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তারা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী এই কূটনৈতিক উদ্যোগ ও কাঠামোগত প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে। একইসঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এই পদক্ষেপগুলো মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ মতামত ব্যক্ত করেন। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সবাই আশা প্রকাশ করেন।