জাতিগঠনের মূল কারিগর শিক্ষক সমাজের প্রাণের দাবি পূরণে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অত্যন্ত জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন যে, বেসরকারি শিক্ষক ও কর্মচারীদের বহুপ্রতীক্ষিত জাতীয়করণের দাবি আজ হোক কিংবা কাল হোক, বাস্তবায়িত হবেই। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর ২০২৬) সকালে রাজধানী ঢাকার রমনা এলাকার ঐতিহাসিক ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের আয়োজিত এক মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আশাব্যঞ্জক বার্তা দেন।
শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান যে, এ দেশের ইতিহাসে যখনই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পেনশন সুবিধা এবং সামাজিক মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে, তার প্রতিটি অধ্যায়ের পেছনে রয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদান। সেই গৌরবময় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বে শিক্ষক-কর্মচারীদের এই দীর্ঘদিনের জাতীয়করণের দাবি খুব দ্রুতই বাস্তবে রূপ লাভ করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বর্তমান এই নির্বাচিত সরকারের বয়স মাত্র সাত মাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত এই সরকার শিক্ষা খাতকে সম্পূর্ণ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে এক অভিনব ও যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ আর্থিক অনুদানে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাদে ৫.৫ কিলোওয়াটের আধুনিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্যানেল স্থাপন করা হবে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে, তেমনি সাপ্তাহিক ছুটি ও অতিরিক্ত সময়ে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করে প্রতিটি স্কুল বা কলেজ মাস শেষে বাড়তি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি, বর্তমান সরকারের জনবান্ধব নীতির কারণে শিক্ষা খাতের বাজেট তিন গুণ এবং স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অবসরে যাওয়া প্রায় এক লাখ শিক্ষক-শিক্ষিকার বকেয়া ভাতা ও পাওনা পরিশোধের জন্য ইতিমধ্যে দুই হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ ফান্ড গঠন করা হয়েছে। জাতীয়করণের সুনির্দিষ্ট পথপদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার জন্য বার্ষিক অতিরিক্ত সাত থেকে আট শ কোটি টাকার প্রয়োজন রয়েছে। তাই শিক্ষকদের প্রতি তার পরামর্শ হলো—একটি সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও বড় পরিসরের জাতীয় মহাসমাবেশ আয়োজন করে মানবিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই জোরালো বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বর্তমান সরকার যে শিক্ষকদের যৌক্তিক দাবির গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করে, সে বিষয়ে তিনি শিক্ষকদের আশ্বস্ত করেন।
সমাজ ও রাষ্ট্রে শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে পারে এমন যেকোনো অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, শিক্ষকই একমাত্র অনন্য পেশা, যা পৃথিবীর বাকি সব পেশার জন্ম দিয়ে থাকে এবং আপনারাই সমাজের মূল চালিকাশক্তি ও গণতন্ত্রের পথপ্রদর্শক। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্ক ও ধোঁয়াশা দূর করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, যতদিন পর্যন্ত দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি জাতীয়করণের আওতায় না আসছে, ততদিন শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় আইনি বা নীতিগত কোনো ধরনের বাধা থাকবে না। এই মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শিক্ষক নেতাদের মধ্যে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভূঁইয়া, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব চৌধুরী মুগীস উদ্দিন মাহমুদ এবং বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেনসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।