রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি মজবুত করতে এবং জনসেবা মানুষের দোরগোড়ায় সরাসরি পৌঁছে দিতে ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই বলে অত্যন্ত দৃঢ় মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন যে, তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসন ও ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্ব হস্তান্তর না করলে দেশে কখনোই একটি কার্যকর, অংশগ্রহণমূলক ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর অভিজাত লা মেরিডিয়ান হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে স্থানীয় সরকার কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট (এলজিসিআরআরপি) আয়োজিত ‘এলজিসিআরআরপি ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট মিশন অ্যান্ড ইউএলজিইপি আইডেন্টিফিকেশন মিশন’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীমুখী অতিরিক্ত জনস্রোত ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, নাগরিক জীবনের সাধারণ ও ছোটখাটো সেবা গ্রহণের জন্য যদি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বারবার রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসতে হয়, তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যই পুরোপুরি ব্যাহত হয়। জন্মনিবন্ধনের মতো অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাথমিক কাজের জন্যেও মানুষকে যদি কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয়ের দুয়ারে ধর্না দিতে হয়, তবে তা দেশের বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারই স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ এলাকায় বসেই সমস্ত প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে ড. মঈন খান বলেন, বাংলাদেশে যেকোনো উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেটির সঠিক ও সফল বাস্তবায়ন। এলজিসিআরআরপি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নে যারা নিরলসভাবে শ্রম দিয়েছেন, তাদের এবং বিশ্বব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সকল উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, কেবল যেকোনো প্রকল্প গ্রহণ ও শেষ করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, বরং বাস্তবায়িত প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে তা ভবিষ্যতের উন্নত উদ্যোগে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি, যেসব জনগণের কল্যাণে প্রকল্পগুলো প্রণয়ন করা হয়, তাদের মধ্যে ওই প্রকল্পের প্রকৃত মালিকানাবোধ তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি, যা প্রকল্পের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকে কেবল কেন্দ্রীয় রাজধানীতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং এর মজবুত বুনিয়াদ রচনা করতে হবে একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজ করার পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক সুযোগ দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে মৌলিক নাগরিক সুবিধার সমস্ত ক্ষেত্র স্থানীয় পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের আরও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নারীদের সাধারণ আসনেও পুরুষ প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার পথ সুগম করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং নারীর ক্ষমতায়ন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রই যুগপৎ শক্তিশালী হবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মোঃ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের প্রধান জেন পেসমি। অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।