ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম নাটোরে প্রবাসীর শপিং মলে হামলা ও লুটপাট, ৫ কোটি টাকার ক্ষতি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চায় না বিএনপি সরকার: প্রতিমন্ত্রী

বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ


  • আপলোড সময় : শনিবার ১০ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:৫৬ এএম

আজ ১০ অক্টোবর ২০২৬, বিশ্ববরেণ্য ও প্রবাদপ্রতিম চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান-এর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অসুস্থতাজনিত কারণে অগণিত ভক্ত ও অনুরাগীকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। পরবর্তীতে শিল্পীর পরম ভালোবাসার জন্মস্থান নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ের সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা নিজ বাসভবনের উত্তর পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় রংতুলির এই জাদুকরকে।

 

বরেণ্য এই শিল্পীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিনব্যাপী গৃহীত এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআন খতম, শিল্পীর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, স্মরণসভা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

 

কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় একটি সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবি। বাবা-মা অত্যন্ত স্নেহে এস এম সুলতানের নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে সুলতান প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেননি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পরেই তাঁর স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর বাধ্য হয়ে তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রচণ্ড ঝোঁক ও অনুরাগ ছিল। বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে তিনি দালানকোঠার ছবি আঁকা শুরু করতেন। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে তিনি কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন বছর চিত্রকলা ও শিল্পের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

 

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা পুরোপুরি সমাপ্ত না করেই তিনি বিশ্বজয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। শিল্পী সুলতান সুদীর্ঘ জীবনে পাকিস্তান, কাশ্মীর ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। অবিরাম ভ্রমণ ও সাধনার মাধ্যমেই তিনি নিজেকে একজন বিশ্বমানের অনন্য চিত্রশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন।

 

জীবদ্দশায় বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের অসাধারণ চিত্রকর্মের প্রদর্শনী বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে তিনি এসব দেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা গ্যালারিতে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অত্যন্ত সফলভাবে অংশ নেন। দেশের ভেতরে রাজধানী ঢাকা এবং নড়াইলে তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মের বড় বড় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত একক প্রদর্শনীগুলো তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশি চিত্রকলার অন্যতম দিকপাল এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের মূল ও অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জনপদের চিরন্তন রূপ এবং অতিবলিষ্ঠ, পেশিবহুল কৃষকসমাজ। তাঁর বিখ্যাত ও কালজয়ী শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ‘চর দখল’, ‘ধান কাটা’, ‘পাট কাটা’, ‘কৃষকের সংগ্রাম’ ও ‘আমার গ্রাম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চিত্রকলায় অনন্যসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে তিনি অসংখ্য সম্মাননা ও ক্রেস্টে ভূষিত হয়েছেন।

 

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী সুলতানের প্রয়াণের পর তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালা ও ‘শিশুস্বর্গ’ নির্মাণ করা হয়। এ ছাড়া শিল্পীর স্মৃতিতে একটি আর্ট কলেজও প্রতিষ্ঠা করা হয়। শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কোমলমতি শিশুরা ছবি আঁকা শেখে। এস এম সুলতানের মতো বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে শিশুরা এখানে আনন্দের সঙ্গে ছবি আঁকা শিখছে। সুলতানের প্রতিষ্ঠিত শিশুস্বর্গে শিক্ষকতা করতে পেরে দারুণ খুশি শিক্ষকেরাও।

 

এস এম সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালায় বর্তমানে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তাঁর দৈনন্দিন জীবনের নানা ব্যবহার্য জিনিসপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। শিল্পীর এসব অমূল্য চিত্রকর্ম এবং তাঁর ঐতিহাসিক বাসভবন দেখতে ও সুলতান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী ছুটে আসেন। চিত্রা নদীর পাড়ের মনোমুগ্ধকর সবুজ-শ্যামল পরিবেশ যেকোনো দর্শনার্থীর মন কেড়ে নেয়। তবে সংগ্রহশালার আয়তন বা পরিধি তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক দর্শনার্থী পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হয়ে ফিরে যান। আশপাশের কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালাকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তর করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন আগত দর্শনার্থীরা।

 

এ বিষয়ে এস এম সুলতান স্মৃতিসংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি জানান, সংগ্রহশালায় বর্তমানে শিল্পী সুলতানের মোট ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি প্রতিরূপ বা রেপ্লিকা প্রদর্শিত হচ্ছে। শিল্পীর আরও বহু চিত্রকর্ম ও নিদর্শন থাকার পরও স্থানসংকুলান না হওয়ায় তা জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। সংগ্রহশালাটি আরও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের একটি প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন পেলে সংগ্রহশালার পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এটি একটি আদর্শ পর্যটনবান্ধব কেন্দ্রে পরিণত হবে।

 

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর