কুমিল্লা
নগরীর রেসকোর্স এলাকার সপ্তম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন-কে সিএনজিচালিত অটোরিকশায়
তুলে প্রথমে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ এবং পরবর্তীতে শ্বাসরোধে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আজ শনিবার (১০
অক্টোবর ২০২৬) সকালে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ
সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য
আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এর আগে ঘাতক
চালকের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিহত স্কুলছাত্রীর ব্যবহৃত একটি আইফোন মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ
সম্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বুধবার (৭
অক্টোবর) রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ভাড়া করেছিল তাজমিন। তবে গন্তব্যে না গিয়ে পদুয়ার
বাজার এলাকা থেকে শহরের বিপরীত দিকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে কিশোরীকে নিয়ে বিজরা এলাকার দিকে রওনা হয় চালক সুমন।
দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পথে গাড়ি ঘুরিয়ে তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালালে তাজমিন তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। কিশোরী প্রাণভয়ে দৌড়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা চালালেও শারীরিক দুর্বলতার কারণে ঘাতকের হাতে কাবু হয়ে পড়ে।
প্রাথমিক
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সুমন পুলিশকে স্বীকার করেছে যে, সেখানে কিশোরীকে ধর্ষণের পর নিজের গামছা
গলায় পেঁচিয়ে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত
করার পর সে পাশের
একটি পুকুরে নেমে গোসল করে এবং নিহতের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে লুট করা মুঠোফোনটি স্থানীয় একটি ধানখেতের ভেতর লুকিয়ে রেখে এবং নিজের অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই ফেলে সে চট্টগ্রামে পালিয়ে
গিয়েছিল। পুলিশ ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা ওই অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন
নম্বর বা নম্বরপ্লেট ধরে
ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে ঘাতক চালক সুমনকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
সংবাদ
সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সুমন পুরো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাকে দ্রুত আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে। আদালতে আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবে কি না—সাংবাদিকদের
এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামিকে আদালতে উপস্থাপন করার পরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট
হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার ও উপপরিদর্শক অর্ণবসহ
জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
উল্লেখ্য,
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৮
অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তাজমিনের নিথর মরদেহ এবং তার পাশে পড়ে থাকা অটোরিকশাটি উদ্ধার করেছিল পুলিশ। নিহত জান্নাতুল তাজমিন মূলত যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। তাঁর বাবা রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করার সুবাদে পরিবার নিয়ে নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল, যদিও স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সে নিয়মিত স্কুলে
অনুপস্থিত ছিল।
পারিবারিক
ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর
সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে নিজ বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। গত বুধবার রাত
১২টা ১৯ মিনিটের দিকে
তাকে শেষবারের মতো কুমিল্লার বিখ্যাত হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীতে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে সে
তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়ে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি আকুল বার্তা পাঠিয়েছিল। কিন্তু গভীর রাত হওয়ায় বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি সময়মতো দেখতে পাননি। পরদিন সকালে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনরা এসে
তা তাজমিনের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের
বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন, যা পরবর্তীতে চাঞ্চল্যকর
এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নতুন মোড় নিয়েছে।