বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে সম্ভাব্য আধুনিক কারিগরি সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপের বন্ধুপ্রতীম দেশ নেদারল্যান্ডস। মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক অভিজ্ঞ মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার নেতৃত্বে আগত এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ডাচ সরকারের পক্ষ থেকে এ কারিগরি আগ্রহ আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করা হয়। এই বিশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকালে তিস্তা প্রকল্পের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা, আধুনিক জ্ঞান হস্তান্তর এবং পরিবেশবান্ধব আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ডাচ সরকারের এই সহযোগিতাপূর্ণ উদ্যোগকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আয়োজিত সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের সার্বিক বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে জানান যে, সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সম্ভাব্য কারিগরি সহায়তা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিস্তারিত গঠনমূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ডাচ প্রতিনিধিদলের প্রধান ও মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা দুই দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও উচ্চমাত্রায় সুসংহত করার ওপর জোর দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'ব্যাপক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সুদীর্ঘ সম্পর্ককে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়ার এখনই সেরা উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে।'
বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডাচ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস উভয়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল বদ্বীপ বা ডেল্টা রাষ্ট্র। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করা এবং নদীভিত্তিক পারস্পরিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার এক বিরাট দিগন্ত উন্মোচিত রয়েছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নেদারল্যান্ডসের সমুদ্র ও নদী থেকে সফলভাবে ভূমি পুনরুদ্ধারের কালজয়ী দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন এবং ডাচ অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশে কাজে লাগানোর আগ্রহ দেখান। ডাচ মন্ত্রীও টেকসই চর উন্নয়ন ও অভিযোজনক্ষম নদী ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি বিনিময়ে একমত পোষণ করেন।
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে ডাচ সমর্থন, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট উত্তরণে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি দেশে মানবাধিকার সুসংহতকরণ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিএনপি অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন। অত্যন্ত সফল এই বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নেদারল্যান্ডস সফরের আনুষ্ঠানিক দ্যুতিময় আমন্ত্রণ জানান মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।