ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,  ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাষ্ট্র সংস্কারে সৎ কর্মকর্তা পদায়ন ও স্বতন্ত্র দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আন্দোলন সরাতে মোদি সরকারের নতুন পদক্ষেপ ড. ইউনূসকে হেনস্তা ও অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা সাবেক ১২ উপদেষ্টার মারা গেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ ২০৩০ বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব অর্জন করল নেটফ্লিক্স রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালো রং: রিমি ও সুজনের জামিন নামঞ্জুর যুক্তরাষ্ট্রে অনভিপ্রেত ঘটনার পরও সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক ড. ইউনূস সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা মামলায় প্রধান আসামির জামিন তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তায় গভীর আগ্রহ প্রকাশ করল নেদারল্যান্ডস আরামকো ও রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার হুমকি, এলাকা ছাড়ার আহ্বান হুথিদের

রাষ্ট্র সংস্কারে সৎ কর্মকর্তা পদায়ন ও স্বতন্ত্র দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:৩৫ পিএম

বিশেষ প্রতিনিধি, আব্দুল কাইয়ুম খান

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে, ক্ষমতার রদবদল ঘটেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত ‘জনবান্ধব প্রশাসন’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত সমাজ’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক বা সংস্কারমুখী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করা এবং প্রশাসনিক স্তরকে গণমুখী করা।

 

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত ও মর্যাদাবান হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সততার ওপর। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন, দক্ষ ও পরীক্ষিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন অপরিহার্য। তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়া প্রায়শই গতি হারায় ভুল সিদ্ধান্ত, দলীয়করণ এবং অসৎ আমলাদের সুচতুর সিন্ডিকেটের কারণে।

 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জনপরিসরে একটি খবর অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে—হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নওশাদ খানকে পুনরায় পদায়ন করা হয়েছে। বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের হয়রানি বন্ধ, সিআইপিদের অনিয়ম রুখে দেওয়া এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় অতীতে তিনি যে সাহসিকতা ও সততার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা দেশবাসীর মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। তাকে আবার একই জায়গায় পদায়ন করা নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের একটি প্রশংসনীয় ও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত। এটি প্রমাণ করে যে সরকার সততাকে মূল্যায়ন করতে চায়।

 

সরকারের উচিত প্রশাসনিক কাঠামোর সব জায়গায় এ ধরনের সাহসী, সৎ ও পেশাদার ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া। অতীতে সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখা এবং সুবিধাবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেই ভুল পথ থেকে সরকারকে বের হয়ে আসতেই হবে।

 

কিন্তু এই ইতিবাচক পদক্ষেপের পাশাপাশি কিছু আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও দৃশ্যমান হয়, যা প্রশাসনিক স্বাভাবিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। উদাহরণস্বরূপ, সিলেটের প্রাক্তন জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলম এবং কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ইকবাল হোসেনকে মাঠ প্রশাসন থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। সরওয়ার আলম তার সততা, সাহসিকতা এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ভেজাল ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন, তা সারা দেশের মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছিল।

 

একইভাবে কুষ্টিয়ার ইকবাল হোসেনও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। এ ধরনের অত্যন্ত জনপ্রিয়, সৎ ও কর্মঠ কর্মকর্তাদের অসময়ে বা অযৌক্তিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া কেবল প্রশাসনিক গতিকেই থামিয়ে দেয় না, বরং সমগ্র আমলাতন্ত্রে একটি ভুল বার্তা পাঠায়। সৎ কর্মকর্তারা মনে করেন, সততার সাথে কাজ করলে পদোন্নতি বা ভালো পদায়ন মেলে না, বরং রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের রোষানলে পড়তে হয়। ফলে তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত।

 

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও নাগরিক সেবার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে রেলের টিকিট কালোবাজারি এবং অব্যবস্থাপনা আমজনতার চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব করিম মিলন এক অভূতপূর্ব ও চ্যালেঞ্জিং প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি সরকারের প্রধানের কাছে মাত্র এক মাস সময় চেয়েছেন এবং বিনিময়ে কোনো বেতন না নিয়ে কেবল যোগাযোগের জন্য একটি গাড়ি সুবিধা চেয়েছেন।

 

তার সুনির্দিষ্ট দাবি—তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-কক্সবাজার রুটের দীর্ঘদিনের জমে থাকা রেলের টিকিট কালোবাজারি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কেন এই ইতিবাচক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে না? যেখানে কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে এবং যাত্রীরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, সেখানে একজন অভিজ্ঞ সাবেক সরকারি কর্মকর্তার এই ধরনের নিঃস্বার্থ প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত। তাকে সসম্মানে এই বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করে সফলতা পরীক্ষা করে দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

আমরা যদি সামগ্রিক প্রশাসনের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব—গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে একধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি গেড়ে বসেছে। কাউকে নির্দিষ্ট করে দোষারোপ বা ব্যক্তিগত শত্রুতা তৈরি না করেও প্রশাসনিক সত্যটি উচ্চারণ করা দরকার। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থায় এখনো এমন অনেকে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসে আছেন, যাদের রাজনৈতিক আনুগত্য বা অসৎ চরিত্র সুপরিচিত। ঘুষ ও অনিয়মকে যারা নিয়ম বানিয়ে ফেলেছেন, তাদের দাপটে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তারা কাজ করার সুযোগ পান না। অথচ এখনো প্রশাসনে অনেক মেধাবী, নীতিবান ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত এই ভালো কর্মকর্তাদের দ্রুত চিহ্নিত করা এবং তাদেরকে উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী জায়গায় পদায়ন করা।

 

দুর্নীতি দমনের বিষয়ে আমাদের বর্তমান কাঠামো একেবারেই অপর্যাপ্ত ও নখদন্তহীন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে একটি নামমাত্র সংস্থায় পরিণত হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ২০ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর বিশাল বহর এবং ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশে দুদকের মোট জনবল মাত্র ২,১৪৬ জন! এই ক্ষুদ্র জনবল ও সীমিত বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে সমগ্র রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা পুরোপুরি অসম্ভব। এত বিশাল প্রশাসনিক ও সরকারি কাঠামোর বিপরীতে এই সীমিত শক্তি দিয়ে দুর্নীতি রোখা রূপকথার মতো।

 

দুদককে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হলে একটি যুগান্তকারী এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কেবল একটি স্বাধীন সংস্থায় সীমাবদ্ধ না রেখে, একটি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র 'দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয়' গঠন করা জরুরি। এই বিশেষ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকবেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। দেশে অনেক মন্ত্রণালয় রয়েছে যাদের কাজের গুরুত্ব বা পরিধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। কিন্তু একটি সর্বক্ষমতাসম্পন্ন ‘দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয়’ গঠিত হলে তা রাষ্ট্র সংস্কারে সবচেয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারবে। কারণ দুর্নীতিরোধ করা সম্ভব হলে অন্যান্য সব মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহুগুণ বেড়ে যাবে।

 

এই প্রস্তাবিত নতুন রূপরেখার আওতায় প্রতিটি জেলায় স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে হবে, যেন যেকোনো অনিয়মের তাত্ক্ষণিক বিচার সম্ভব হয়। সাধারণ সরকারি অফিসের মতো দেশের প্রতিটি উপজেলায় দুদকের নিজস্ব সুসজ্জিত কার্যালয় স্থাপন করতে হবে। দুদকের মোট জনবল অন্তত ২০ হাজারে উন্নীত করতে হবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সর্বাধুনিক যানবাহন ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কাঠামো গঠনের আগে দুদক নিজেকে দিয়ে সংস্কার শুরু করবে। দুদকের ভেতরে যেসব অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা লুকিয়ে আছেন, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও আইনের আওতায় আনতে হবে। অতীতে রাষ্ট্রকে লুটপাট করা শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

 

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, নতুন মন্ত্রণালয় স্থাপন ও এত জনবল বৃদ্ধিতে সরকারের বিশাল অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু অর্থনীতি ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কোনো সাধারণ ব্যয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ। সরকার যদি দুর্নীতি দমন মন্ত্রণালয় গঠন ও শক্তিশালীকরণে ১,০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়, তবে তার সরাসরি সুফল হিসেবে অনিয়ম ও পাচার বন্ধ হয়ে সরকারের রাজস্ব কোষাগারে অন্তত ১ লক্ষ কোটি টাকা সাশ্রয়ী হবে এবং নতুন রাজস্ব জমা হবে। রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা যখন চুরি ও পাচার হওয়া থেকে বেঁচে যাবে, তখন সেই অর্থ দেশের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

 

পরিশেষে বলা যায়, সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সঠিক স্থানে পদায়ন করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি নতুন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে পুরো ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো কেবল সময়ের দাবি নয়, এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যে সরকার সৎ কর্মকর্তাকে সম্মানিত করতে পারে এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পরিকাঠামো তৈরি করতে পারে, সেই সরকারই ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকে। আশা করি, বর্তমান নীতি-নির্ধারকেরা এই বাস্তবমুখী প্রস্তাব ও সংস্কার ভাবনা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং একটি সমৃদ্ধ, সুশাসিত ও অন্যায়মুক্ত বাংলাদেশ গঠনে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবেন।



এ সম্পর্কিত আরো খবর