ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,  ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্পেনে দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৩৯ দেশে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৯৮২ জাপানের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের উদাত্ত আহ্বান তারেক রহমানের বাউফলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে কিন্ডারগার্টেন ও দুর্নীতির অভিযোগ ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে ইসি ইসরায়েলে নির্বাচন: ৬০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ, এগিয়ে নেতানিয়াহুর দল খাদ্যে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করতে দ্রুত আইন প্রণয়নের তাগিদ প্রতিমন্ত্রীর ক্রসফায়ার মন্তব্যে কোণঠাসা আইজিপি, আলোচনায় ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান রংপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাসই গড়বে সুস্থ প্রজন্ম: মীর শাহে আলম

নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন বিস্ফোরণ মামলার ঐতিহাসিক বিচার শুরু জার্মানিতে


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:২৯ এএম

জার্মানির হামবুর্গের একটি আদালতে ২০২২ সালের বাল্টিক সাগরের তলদেশে অবস্থিত নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার ঐতিহাসিক বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। ইউরোপের জ্বালানি ও ভূ-রাজনীতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেওয়া এই হামলায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সার্হি কে. নামের এক ইউক্রেনীয় নাগরিককে অভিযুক্ত করেছে জার্মানির কৌঁসুলিরা।

 

 তাদের গুরুতর দাবি, ইউক্রেন সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ও প্রত্যক্ষ মদদে এই দুঃসাহসিক এবং ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনায় প্রথমবারের মতো কোনো রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বা সামরিক সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করে কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ তদন্ত ও বহুজাতিক আইনি প্রক্রিয়ার পর অভিযুক্ত সার্হি কে.-কে জার্মানির আদালতে সোপর্দ করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নজিরবিহীন ও সংবেদনশীল মোড় এনে দিয়েছে।

 

জার্মান প্রসিকিউটরদের তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মূল অভিযুক্ত সার্হি কে. ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নির্দেশে পরিচালিত বিশেষ সামরিক দলের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাকে বিস্ফোরণ ঘটানো, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির অপপূরণীয় ক্ষতি সাধন, জনসেবামূলক খাত ব্যাহত করা এবং বেসামরিক পরিকাঠামোয় হামলার মাধ্যমে সরাসরি 'যুদ্ধাপরাধের সহযোগী' হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

 

এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া থেকে ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের সবপথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া। এতে করে মস্কো যেন তাদের গ্যাস বিক্রি থেকে অর্জিত বিশাল রাজস্ব আয় ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থায়নে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এই বিশেষ হামলার মূল লক্ষ্য। এই মামলায় জড়িত ভ্লাদিমির জেড. নামের আরও একজন ইউক্রেনীয় নাগরিক বর্তমানে ক্রোয়েশিয়াতে আটক রয়েছে। এর আগে সে পোল্যান্ডে গ্রেপ্তার হলেও সেখান থেকে তাকে জার্মানিতে প্রত্যর্পণের আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

 

নর্ড স্ট্রিম হলো মূলত বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে রাশিয়া থেকে সরাসরি জার্মানি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অত্যন্ত জটিল ও দ্বিমুখী পানির নিচের গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। নর্ড স্ট্রিম ও নর্ড স্ট্রিম ২ নামে পরিচিত এই দুই সুবিশাল পাইপলাইন সিস্টেমের বার্ষিক সম্মিলিত জ্বালানি পরিবহন ক্ষমতা ছিল প্রায় ১১০ বিলিয়ন ঘনমিটার। ২০১১ সালে নর্ড স্ট্রিমের প্রথম লাইনটির নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয় এবং ২০১২ সালে বাণিজ্যিকভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। অন্যদিকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত দ্বিতীয় পাইপলাইন নর্ড স্ট্রিম ২-এর নির্মাণ কাজ ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সমাপ্ত হলেও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো সচল বা চালু হতে পারেনি।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করেই ডেনমার্ক ও সুইডেনের ভূখণ্ডীয় জলসীমায় পাইপলাইনে বিকট বিস্ফোরণের পর বিশাল গ্যাস লিকেজের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুদিনের মধ্যে নর্ড স্ট্রিম এজি নামক পরিচালনকারী প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করে যে, পাইপলাইন নেটওয়ার্কের দুটি ব্যবস্থাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং চিরতরে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

 

হামলার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে সমুদ্রের নিচে বিস্ফোরণের পর কয়েক সপ্তাহ ধরে অনবরত ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গমন অব্যাহত থাকে। পানির নিচে প্রচণ্ড গ্যাসে সমুদ্রের উপরিভাগ অশান্ত রূপ ধারণ করে। পরবর্তীতে দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালিয়ে পাইপলাইনের অভ্যন্তরীণ চাপ স্বাভাবিক করা হলে গ্যাস বের হওয়া বন্ধ হয়। ঘটনার পরপরই রাশিয়ান ফেডারেশন এই ধ্বংসাত্মক আঘাতকে 'আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ' হিসেবে ঘোষণা করে নিজেদের দেশে একটি উচ্চপর্যায়ের অভ্যন্তরীণ অপরাধমূলক মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে।

 

এই ধ্বংসাত্মক ঘটনার পরপরই মস্কো ও পশ্চিমাদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি ও মারাত্মক দ্বিমুখী অভিযোগের ঝড় ওঠে। ঘটনার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোজা আঙুল তোলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর দিকে। পুতিন প্রকাশ্যে অভিযোগ করে বলেন যে, ইউক্রেন ও পোল্যান্ডসহ যেসব দেশ ইউরোপে নতুন তেলের বাজার পেতে চায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত রয়েছে, তারাই মূলত নর্ড স্ট্রিম ধসে সবচেয়ে বড় 'উপকারভোগী'। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করে দেওয়া পশ্চিমাদের বক্তব্যকে 'সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর ও হাস্যকরভাবে বোকা' বলে উড়িয়ে দেন। পেসকভ যুক্তি দেন যে, নিজস্ব বিলিয়ন ডলারের গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের সবচেয়ে লাভজনক পথ রাশিয়া কেন বন্ধ করতে যাবে, যার কোনো যুক্তি নেই।

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং পোল্যান্ডের মতো পশ্চিমা প্রভাবশালী দেশগুলো এই ঘটনার পেছনে শুরুতেই রাশিয়ার দিকে অভিযোগ তোলে। পরবর্তীতে তদন্তের মোড় ইউক্রেনীয় নাগরিকদের দিকে ঘুরলে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার এসব দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে। ওয়াশিংটন সরাসরি এটিকে 'রাশিয়ার তথ্য বিকৃতি ও অপপ্রচার' হিসেবে অভিহিত করে। অপরদিকে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক প্রকাশ্যে অত্যন্ত কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন যে, জার্মানির উচিত হবে না এই নর্ড স্ট্রিম ধ্বংসকারী মূল আসামিদের কোনোভাবে বিচার করা। টাস্ক খোলামেলাভাবে মন্তব্য করেন যে, যারা নর্ড স্ট্রিমের মতো ক্ষতিকর রাশিয়ান প্রকল্প তৈরি করেছিল তাদের মূলত লজ্জা পাওয়া উচিত, আর যারা এই পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্পটিকে অকেজো করে দিয়েছে তাদের বিচার করা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়।

 

ব্রিটিশ সরকারও রাশিয়ার তোলা যাবতীয় আন্তর্জাতিক অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে জানিয়ে দেয় যে, রাশিয়া নিজের অপকর্ম ও পরাজয় ঢাকতে বিশাল আকারের মিথ্যা দাবি প্রচার করছে। এর বিপরীতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুরু থেকেই নিজেদের সরকারের জড়িত থাকার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এসেছেন। জেলেনস্কি জোর দিয়ে স্পষ্ট করে জানান যে, কিয়েভ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের ওপর কোনো ধ্বংসাত্মক বা সামরিক অভিযানের সাথে জড়িত ছিল না কিংবা কোনো নির্দেশ প্রদান করেনি। তিনি আরও দাবি করেন যে, ইউক্রেন সরকার এ বিষয়ে জার্মান সরকারের সাথে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ে খোলামেলা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেছে এবং জার্মান কর্মকর্তারা ভালো করেই জানেন যে কিয়েভ বা ইউক্রেন প্রশাসন এ হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে যুক্ত ছিল না।

 

জার্মান প্রসিকিউটরদের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হামলার এক অবিশ্বাস্য রূপরেখা। অভিযানের মূল মাস্টারমাইন্ড সার্হি কে.-কে ২০২৫ সালের আগস্টে ইতালির রিমিনির কাছাকাছি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইতালীয় পুলিশ তাকে দীর্ঘ তিন মাস পর জার্মানির হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ করে। সেই থেকে তিনি হামবুর্গ শহরের বিশেষ প্রি-ট্রায়াল কাস্টডি বা জেলহাজতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আটক রয়েছেন। জার্মানির বিশেষ তদন্তকারী দলের দাবি অনুযায়ী, সার্হি কে. ও তার সশস্ত্র সহযোগীরা সম্পূর্ণ ভুয়া ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে জার্মানিতে অনুপ্রবেশ করেছিল। এরপর তারা ছদ্মবেশে 'অ্যান্ড্রোমিডা' নামের একটি সাধারণ বিলাস বহুল ইয়ট ভাড়া করে অপারেশনের জন্য সমুদ্রে যাত্রা করে।

 

জার্মান ফরেনসিক দল পরবর্তীতে তদন্তের উদ্দেশ্যে অ্যান্ড্রোমিডা ইয়টে অভিযান চালিয়ে ভেতরে এইচএমএক্স (HMX) এবং আরডিএক্স (RDX) নামক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও শক্তিশালী সামারিক গ্রেডের বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ ও রাসায়নিক রাসায়নিক নমুনা খুঁজে পায়। প্রসিকিউটরদের তথ্য মতে, অভিযুক্ত এই দলটির পেশাদার ডুবুরিরা কৌশলগতভাবে ডেনমার্কের বরনহোম দ্বীপের কাছে সমুদ্রের অতলে ডুব দিয়ে পাইপলাইনের স্পর্শকাতর অংশে বিশেষ টাইমার লাগানো শক্তিশালী বিস্ফোরকগুলো বেঁধে দিয়ে আসে। ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ বিস্ফোরক স্থাপনের কাজ শেষ করা হয়। এর ঠিক চার দিন পর অর্থাৎ ২৬ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত সময়ে সাগরের তলদেশে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে, যা পাইপলাইনগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে স্থায়ীভাবে অকেজো ও অকার্যকর করে দেয়।

 

যদিও অভিযুক্ত সার্হি কে. শুরু থেকেই তাকে আনীত সকল সামরিক ও অপরাধমূলক অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এসেছেন, তবুও জার্মানির আদালত তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ নিয়ে বুধবার থেকে শতাব্দীর অন্যতম বৃহত্তম আইনি লড়াই শুরু করতে চলেছে। ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আন্তর্জাতিক সমীকরণ বদলে দেওয়া এই নর্ড স্ট্রিম বিস্ফোরণের বিচারের দিকে এখন পুরো বিশ্ব নজর রাখছে।

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর