অযত্ন ও অবহেলায় চট্টগ্রাম নগরীর দেওয়ানহাট রেলওয়ে মার্শালিং ইয়ার্ডে পড়ে আছে শত কোটি টাকায় কেনা রেলের পণ্য পরিবহনের স্পেশাল কার ক্যারিয়ার, গার্ড ব্রেক কিংবা রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান। বগির ভেতরে জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ আর যন্ত্রাংশে পড়া মরিচার দাগই মূলত দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলছে।
রেলওয়েকে লাভজনক করে তুলতে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে ২০২৩ সালে ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এমন ১২৫টি আধুনিক লাগেজ ভ্যান কেনা হয়েছিল। চালুর পর কিছুদিন সীমিত পরিসরে ব্যবহার হলেও তা লাভজনক না হওয়ায় একপর্যায়ে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এসব ভ্যান বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের যথাযথ সমীক্ষা বা টেকসই পরিকল্পনা ছাড়াই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করায় এখন কয়েকশ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার (ম্যানেজার) সুজিত কুমার বিশ্বাসের কাছে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি জানান, তাঁদের কিছু লাগেজ ভ্যান বিভিন্ন ট্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও অধিকাংশ ট্রেনেই তা নেই। এর মধ্যে কিছু রেফ্রিজারেটেড লাগেজ ভ্যান রয়েছে, যা বর্তমানে কোনো কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে না।
পরবর্তীতে রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানান। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঞা জানান, স্পেশাল কার ক্যারিয়ার ও রেফ্রিজারেটেড ভ্যানগুলো বর্তমানে কোনো ট্রেনের সঙ্গেই সংযুক্ত নেই। এগুলোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে একমাত্র বাণিজ্যিক বিভাগই বলতে পারবে, আর কারিগরি বিষয়গুলো প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (সিএমই) ভালো বলতে পারবেন। তবে পুরো বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় সম্পাদিত হয়েছিল।
এদিকে সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় করার উদ্দেশ্যেই অতীতে ডেমু ট্রেনের মতো প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছিল। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চরম অভাবে বারবার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, আর রাষ্ট্রীয় রেল খাত পরিণত হয়েছে মুনাফাভোগীদের ব্যবসার হাতিয়ারে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সুজনের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেগা প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধান উদ্দেশ্য কখনোই রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ সাধন থাকে না। বরং যারা নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কীভাবে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়া যায় এবং দিনশেষে পকেটে কত টাকা ঢোকানো যাবে। অতীতে অন্যায় করার পরও কেউ শাস্তির আওতায় না আসায় এ ধরনের দুর্নীতি ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, রেলওয়ের বহরে নতুন এই ১২৫টি লাগেজ ভ্যান যুক্ত হওয়ার আগে পুরোনো লাগেজ ভ্যানের সংখ্যা ছিল ৫০টি, যার মধ্যে সচল ছিল মাত্র ১৮টি।