ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,  ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বড় অভিযোগ বেগমগঞ্জে ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি ১০ লাখ টাকার চুক্তি ও ফাঁদে পরীক্ষার্থীরা ভারতীয় বিমানের জন্য আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়াল পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের মাঠে ঢুকে পড়ল চালকহীন ট্রাক: শিশুসহ ২ জনের মৃত্যু কানাডার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, হতাহতের আশঙ্কা রিয়ালের ৫৮ বছরের রেকর্ডে ভাগ বসাল হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা বিক্ষোভে উত্তাল প্যারিস: আটটি বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে সংঘবদ্ধ লুটপাট ফ্রান্সজুড়ে ভয়াবহ সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০, আহত ১৫০ পুলিশ সদস্য ভারতের মধ্যপ্রদেশে ট্রাকচাপায় মন্দিরে যাওয়ার পথে ১২ পুণ্যার্থী নিহত

ফ্রান্সজুড়ে ভয়াবহ সহিংসতা, গ্রেপ্তার ১২০০, আহত ১৫০ পুলিশ সদস্য


  • আপলোড সময় : রবিবার ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:২৫ এএম

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট ও দুরবস্থার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর ভাষ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় ১৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

 

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে শনিবার দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের ভাষায়, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যায়। বিভিন্ন সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে হামলার পাশাপাশি কয়েকটি স্থানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক ভবনও এ তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি।

 

প্যারিসে বিকেলের দিকে প্রধান মিছিলটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কয়েকটি দল রাস্তায় আগুন জ্বালায় এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করে। শহরের বিখ্যাত রিপাবলিক চত্বরেও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালানো হয় এবং অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও দেখা যায়। দাঙ্গা পুলিশকে প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে যেতে এবং লাঠি দিয়ে কয়েকজনকে আঘাত করতে দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।

 

প্যারিসের ‘লা বারিক’ নামের একটি পানশালায় আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়। পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাটের পাশাপাশি লিল শহরে একটি অ্যাপল বিপণিকেন্দ্রে ঢুকে মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় লিমোজ শহরে। সেখানে ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলে আগুন লাগার পর ভবনটির ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ে। আগুন নিয়ন্ত্রণে অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা কাজ করলেও ঐতিহাসিক ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

লিওঁ শহরেও আগুনের ঘটনা ঘটেছে। শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসে পর্যটন দপ্তরের ভবনে অগ্নিসংযোগকে শহরের জন্য ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ভবনটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহাসিক হওয়ায় এর ক্ষতি শহরবাসীর জন্য হৃদয়বিদারক। স্থানীয় পুলিশের অভিযোগ, কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেয়।

 

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সাঁত এতিয়েন শহরেও গুরুতর ঘটনা ঘটে। শহরটির মেয়র রেজিস হুয়ানিকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, একটি বিস্ফোরক নিক্ষেপকারী অস্ত্রের বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে। এ ঘটনাকে মর্মান্তিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন দুর্ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত নয়।

 

এ ছাড়া গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মনপেলিয়ে ও ভ্যালঁসসহ বিভিন্ন শহরে ভবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। গ্রেনোবলে মুখোশধারী কয়েকজনকে একটি সরু সড়ক দিয়ে পর্যটকবাহী ছোট ট্রেন চালিয়ে অন্তত তিনজন দাঙ্গা পুলিশের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে। বিবিসির যাচাই করা দৃশ্যচিত্রে এ ঘটনা উঠে এসেছে।

 

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে লক্ষ্যবস্তু করে সহিংসতা চালানো হয়েছে। এসব ঘটনায় মুখঢাকা ব্যক্তিদের জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে আসছিলেন। শনিবার তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও অন্যান্য প্রতিবাদী গোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা। ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ আন্দোলন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছিল।

 

দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগামী বছর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। জনমত জরিপে আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জাতীয় সমাবেশ দলের নেতা মেরিন লে পেন ও বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোডের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা উঠে এসেছে।

 

মেলঁশোঁ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নিন্দা জানান। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু তাঁর বক্তব্যকে বিপজ্জনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, পুলিশ অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার মুখে পড়েছে। কিছু গোষ্ঠী আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বিক্ষোভকে প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা হিসেবে ব্যবহার করছে। সহিংসতার মাধ্যমে কাউকে রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।

 

অন্যদিকে, মেরিন লে পেন অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য দাবিগুলো চরম বামপন্থীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, সরকারি প্রশাসনিক কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও টাউন হলে হামলা এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

 

সরকার সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়ারও চেষ্টা করেছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অতিরিক্ত তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে এসব উদ্যোগের পরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে।

 

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর