সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে তথাকথিত ‘অনৈতিক’ কাজের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিচার প্রক্রিয়ার পর দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, গোপন বিচার কার্য এবং চূড়ান্ত সাজা বাস্তবায়নের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর কোনো ধাপে সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের পরিবার বা বাংলাদেশ মিশনকে কোনো প্রকার অবহিত না করায় বড় প্রশ্ন উঠেছে—সৌদি আরব কি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভিয়েনা কনভেনশন সরাসরি লঙ্ঘন করল? কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই অত্যন্ত গোপনে শাস্তি কার্যকর করার পর এখন আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাধ্যবাধকতার আলোকে দেশটির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যার দাবি জানাচ্ছে ঢাকা।
জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ওই দুই নাগরিককে আটক, পরবর্তীতে তাদের আইনি বিচার পরিচালনা এবং চূড়ান্ত সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো তথ্যই সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আগে বা পরে নিশ্চিত করেনি। বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মারফত ছড়িয়ে পড়ার পর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয় ঘটনার বিস্তারিত বিবরণী চাওয়া হয়েছে। তবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বাংলাদেশের পাওনা ব্যাখ্যার জবাব দিতে রিয়াদ আইনত কতটা বাধ্য এবং নিহতের মরদেহ আদৌ নিজ দেশে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কনস্যুলার অধিকার সংক্রান্ত ১৯৬১ ও ১৯৬৩ সালের ঐতিহাসিক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক কোনো দেশে আটক বা বন্দি হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে অনতিবিলম্বে তার দেশের দূতাবাসকে অবহিত করতে হয়। ভিয়েনা প্রটোকলের ধারা ৩৬-এ স্পষ্ট করে বলা আছে, বিদেশি বন্দিকে অবশ্যই তার নিজ দেশের কনস্যুলার সুবিধা গ্রহণ করার আইনি অধিকারের কথা জানাতে হবে এবং দূতাবাসকে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। ১৯৮১ সালে সর্বসম্মতভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে এই ন্যূনতম আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পালন করেনি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ড. রায়হান রশীদ উল্লেখ করেছেন যে, কোনো বিচারিক আপিল প্রক্রিয়া শেষ না করে তড়িঘড়ি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা নয়, তাই ঘটনাটি একদিনে ঘটেনি। কিন্তু পুরো দীর্ঘ সময় প্রক্রিয়ায় ভিকটিম কিংবা সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসকে কোনো তথ্য না দেওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও আন্তর্জাতিক নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, আটককৃতরা যদি লিখিতভাবে কনস্যুলার সুবিধা নিতে অস্বীকার করে, কেবল তখনই আয়োজক রাষ্ট্রের কোনো দায় থাকে না। কিন্তু এই দুই বাংলাদেশি নাগরিক আদৌ সেই তথ্য জানতে পেরেছিলেন কি না, তার লিখিত কোনো প্রমাণ সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একই সুর তুলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরীফুল হাসান বলেন, পুরো বিচার ও সাজা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব প্রকাশ্যে ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এর আগেও বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে রিয়াদ। তার প্রশ্ন, এই একই অভিযোগ বা অপরাধের মুখোমুখি যদি কোনো মার্কিন বা ইউরোপীয় নাগরিক হতেন, তবে কি সৌদি আরব কোনো ধরনের নোটিশ বা কনস্যুলার সুবিধা না দিয়ে এমন গোপনীয়তা বজায় রেখে সাজা কার্যকর করার সাহস পেত?
এদিকে সাবেক জ্যেষ্ঠ রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির অবশ্য বিষয়টির অভ্যন্তরীণ আইনি দিকের প্রতি আলোকপাত করে জানান যে, দেশের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের বিচারে স্বাগতিক দেশের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র যদি তাদের নাগরিকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে চায়, তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বার্থে তা জানানোই স্বাভাবিক নিয়ম।
অন্যদিকে, চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুজনের লাশ বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে বা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো প্রক্রিয়ায় তা হস্তান্তর করা হবে কি না, তার কোনো স্পষ্ট বার্তা রিয়াদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষ দাপ্তরিকভাবে বাংলাদেশকে কোনো তথ্য না দেওয়ায় নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ বা সমবেদনা জানানো সম্ভব হচ্ছে না। সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রক্রিয়াগতভাবে অন্ধকারে রেখে আন্তর্জাতিক কনস্যুলার সুবিধা বঞ্চিত করার এই ঘটনা বাংলাদেশ ও সৌদির মধ্যকার কূটনৈতিক চর্চায় এক বড় ধরনের অস্বস্তি এনে দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা