জীবনযাত্রার
ব্যয়বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারকে কেন্দ্র
করে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্সে যে দাবানল জ্বলে
উঠেছে, তা এখন দেশটির
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সাধারণ মানুষের শান্তিপূণ আন্দোলন মুহূর্তের মধ্যে নজিরবিহীন সহিংসতা, ভাঙচুর ও সর্বগ্রাসী লুটপাটে
রূপ নেওয়ায় এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির
সৃষ্টি হয়েছে। রাজপথের এই চরম নৈরাজ্য
দমনে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর
ব্যাপক অভিযানে একদিনেই গ্রেপ্তার হয়েছে আড়াই হাজারের কাছাকাছি মানুষ। একইসঙ্গে শত শত পুলিশ
সদস্যের রক্ত ঝরার ঘটনায় পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
স্কুলশিক্ষা
সংস্কার ও সাধারণ মানুষের
জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদে ফ্রান্সে চলমান আন্দোলন এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অহিংস ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের
রূপ বদলে তা ভয়াবহ সহিংসতা
ও ব্যাপক লুটপাটে পর্যবসিত হয়েছে। পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভে সহিংসতা ছড়ানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করে হামলা চালানো, সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির
মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধন এবং জননিরাপত্তায় গুরুতর হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে ফ্রান্সজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ২
হাজার ৩৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর
শনিবারের এই আকস্মিক ও
ব্যাপক অভিযানে পুরো দেশজুড়ে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনকারীদের
সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে গত এক মাসে
ফ্রান্সে প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি
পুলিশ সদস্য ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা
মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, বিক্ষোভে সহিংস হামলায় মোট ৯৯৭ জন পুলিশ ও
নিরাপত্তা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং এর মধ্যে অন্তত
সাতজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ও গুরুতর বলে
জানা গেছে। এছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রধান শহরে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি
বাণিজ্যিক দোকানপাট ও বিপণিবিতান ব্যাপক
ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার
হয়েছে। খুচরা ও বাণিজ্য খাতের
প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এই দেড় হাজার
দোকানের একটি বড় অংশই প্রকাশ্য
লুটপাটের কবলে পড়েছিল। ফ্রান্সের খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিটেইল অ্যান্ড ট্রেড ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্দ্রে বোম্পার এলসিআই টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন
যে, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির
পরিমাণ ‘কয়েক শ’ মিলিয়ন ইউরো’
ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ
ও সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক হিসাব দেওয়ার সময় এখনো হয়নি।
জীবনযাত্রার
ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শনিবার
ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার
জন্ম দেয়। রবিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, মোট ২ হাজার ৩৯৭
জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং ৯৯৭ জন পুলিশ ও
নিরাপত্তা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ
করেছেন। রবিবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ও কঠোর ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ চলমান এই ভয়াবহ সহিংসতার
তীব্র নিন্দা জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আজ আমরা ক্ষুব্ধ,
লজ্জিত। যে অভূতপূর্ব ও
অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা চলছে, তার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। যারা আন্দোলনের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে,
তাদের অবশ্যই এর চড়া মূল্য
দিতে হবে।”
দাঙ্গাবাজ
ও নৈরাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সরকার অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান
বজায় রাখবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দেশের প্রধান প্রধান শহর, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন এবং বাণিজ্যিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে দেশের মেয়রদের সাথে নিবিড় সমন্বয় করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। সাধারণ মানুষের শহরের রাস্তাঘাট এভাবে তছরুপ ও ধ্বংস হতে
দেখাটা সম্পূর্ণ অসহনীয় একটি বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে এই সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত
হওয়া বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে যথাসম্ভব আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। (সূত্র: ফ্রান্স ২৪ ডটকম, ফার্স্টপোস্ট)