বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের তীব্র অস্থিরতা এবং দেশীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মারাত্মক ঘাটতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্প এক নজিরবিহীন ও কঠিন সংকটের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। সার্বিক এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা পুরো জাতীয় অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
ঢাকার উত্তরের আশুলিয়ায় অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানায় প্রবেশ করলেই দেখা মেলে কর্মব্যস্ততার এক ভিন্ন চিত্র। কারখানার প্রতিটি ফ্লোরে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জিগস মেশিন দিয়ে সুনির্দিষ্ট মাপে ডেনিমের কাপড় কাটার পর তা সেলাই করে জিন্স, স্কার্ট ও জ্যাকেটে রূপ দেওয়া হচ্ছে। এরপর ওয়াশিং, আয়রনিং, বোতাম ও জিপার লাগানোর পর ব্র্যান্ড লেবেল সাঁটানো হয়। গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসিপেনির মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ হাজার কর্মী মিলে প্রতি মাসে ৯৩ লাখ তৈরি পোশাক উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন ভঙ্গুর অবস্থার কারণে মাঝেমধ্যেই কারখানার বাতি নিভে যায় এবং বিকট শব্দে চালু করতে হয় ডিজেল চালিত জেনারেটর।
হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটির প্রধান তানুল চক্রবর্তী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনকে জানান, বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত শোচনীয় এবং এখানে ঘন ঘন লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গ্যাসের পর ডিজেলই তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, যেখানে গ্রিডের বিদ্যুৎ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। মূলত দেশের পুরো অর্থনীতিই বর্তমানে এক প্রকার ডিজেলের ওপর ভর করে টিকে আছে। প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হলেও, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দেশটির আমদানিনির্ভর জ্বালানি নিরাপত্তাকে অত্যন্ত নাজুক করে তুলেছে। রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর শিল্পখাতে গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে স্পট মার্কেটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির দাম প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
তৈরি পোশাক খাতের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ, কারণ এটি দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস। এই খাতে সরাসরি প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৫ সালে এই খাত থেকে ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। শুধু হা-মীম গ্রুপ একাই শত কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে থাকে। তবে এই জ্বালানি সংকট কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো গ্লোবাল সাউথজুড়েই এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ফিলিপিন্স সপ্তাহে চার কর্মদিবস চালু রাখতে বাধ্য হয়েছে। পাশাপাশি নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও ইথিওপিয়ায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় পরিবহন এবং জেনারেটরচালিত বিদ্যুতের খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যার জেরে সাধারণ খাদ্যপণ্যের দামও চড়েছে।
অভ্যন্তরীণ কিছু ত্রুটিপূর্ণ নীতি ও অবকাঠামোগত অবহেলা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটিতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অনীহার কারণে বর্তমানে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেকই মেটাতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির মাধ্যমে। জুলাই-আগস্টে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালী ঘিরে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুটি ভাসমান রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালের একটিতে আগুন লাগার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকারের জন্য জ্বালানি খাত নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক শক্তির নানা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ঢাকাকে এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক টানাপোড়েন এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জ্বালানি স্বনির্ভরতা অর্জনই এখন বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।