ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,  ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
তদন্তের আশঙ্কায় ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ইলন মাস্কের হুঁশিয়ারি হরমুজে কুয়েতি তেল ট্যাংকারে হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ক্রুরা ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনায় ক্ষুব্ধ ম্যাক্রোঁ গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা উপসাগরে মার্কিন কর্মী প্রত্যাহারের খবর ভিত্তিহীন: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বায়ুদূষণে বিশ্বে পঞ্চম ঢাকা, স্কোর রেকর্ড ১৭৩ ইশরাকের পদত্যাগ: কী বার্তা দিচ্ছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন? বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতিতে বিপাকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নরসিংদীতে প্রিন্টিং কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৬ ৭ দিন পর কারামুক্ত ককরোচ জনতা পার্টির দুই নেতা

ইশরাকের পদত্যাগ: কী বার্তা দিচ্ছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন?


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:৩৬ এএম

রাজনীতির মাঠে অপ্রত্যাশিত এক মোড় পরিবর্তনে গত ১৯ অক্টোবর প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান ইশরাক হোসেন। মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের চাঞ্চল্যকর ঘটনার জেরে মন্ত্রিসভা থেকে তার এই পদত্যাগ কেবল সরকারের ভেতরকার প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই সামনে আনেনি, বরং রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক সমীকরণ জন্ম দিয়েছে। অনেকে একে নিছক দলীয় জবাবদিহি হিসেবে দেখলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা—তবে কি এই পদত্যাগের মধ্য দিয়েই আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মেয়র নির্বাচনে ইশরাক হোসেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ আরও সুগম ও উন্মুক্ত হয়ে গেল?

 

মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নেওয়ার পর পরই এই প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের রেললাইন সংলগ্ন একটি বস্তিতে পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে আকস্মিক এক মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন ইশরাক। সেই সময় তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় তোলে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পদে থেকে এভাবে সরাসরি অস্ত্র হাতে মাঠে নেমে অভিযান চালানো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে চারপাশেই। সমালোচনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। গত ১৯ অক্টোবর দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি। তার এই আকস্মিক পদত্যাগে একদিকে যেমন সরকার সাময়িক রাজনৈতিক অস্বস্তি ও সমালোচনা থেকে কিছুটা দায়মুক্তি পেয়েছে, অন্যদিকে বিএনপির অন্দরে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

 

দলের একটি পক্ষ মনে করছে, এই পদত্যাগের ঘটনাটি শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট একটি বার্তা। কিন্তু এর বিপরীতে আরেকটি শক্তিশালী পক্ষের জোরালো মত হলো, এর নেপথ্যে রয়েছে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। কারণ, ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ধ্যান-জ্ঞান এবং দীর্ঘদিনের মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হওয়া। তার প্রয়াত বাবা অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং পুরান ঢাকায় তাদের পরিবারের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইশরাক সবসময় নিজেকে নগরপিতার আসনে দেখার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বিশেষ করে গত জুলাই আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র হিসেবে নিজের পক্ষে হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর তার রাজনৈতিক তৎপরতা ও জনসম্পৃক্ততা সেই ধারণাকে আরও বহুগুণ স্পষ্ট করে তুলেছিল। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতের প্রার্থী ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর মতো উদীয়মান ও তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপরীতে বিএনপি শিবিরে ইশরাক হোসেনকেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিকল্পহীন প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করছে তৃণমূলের বড় একটি অংশ।

 

যদিও দলের ভেতরে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে কেবল ইশরাক একা নন, বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও সমানভাবে আলোচনায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও ইশরাকের সমর্থকদের জোরালো দাবি, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালনকালে সরকারি নিয়মনীতি ও প্রটোকলের বেড়াজালে তিনি স্বাধীনভাবে মাঠে নেমে গণসংযোগ বা রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারছিলেন না। অন্যদিকে বিরোধী দল বা দলের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা অনেকটা উন্মুক্তভাবেই নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এখন যেহেতু তার কাঁধে কোনো মন্ত্রিত্বের সরকারি বোঝা বা প্রটোকলের সীমাবদ্ধতা নেই, তাই তিনি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে ময়দান গোছাতে পারবেন। মূলত মন্ত্রিসভা থেকে এই অব্যাহতি তাকে আগামী দিনের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে এক অবারিত ও পরিষ্কার পথ তৈরি করে দিয়েছে। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে কিছুটা মতপার্থক্য ও সমালোচনা এখনও পুরোপুরি থিতিয়ে যায়নি।

 

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা বেশ কঠিন। তবে ইশরাককে নিয়ে কিছু গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গিতে দ্বিচারিতা স্পষ্ট লক্ষ্য করা গেছে। তার মাদকবিরোধী অভিযানের সমালোচনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ইতিবাচক দিকগুলোও সামনে এসেছে। তার পদত্যাগের পেছনে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তার সমর্থকরা এমন ধারণা করতেই পারেন, আবার সাধারণ মানুষও ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। তার মতে, শুধু ইশরাক নন, যে কেউই নিজেকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে পারেন এবং এতে দোষের কিছু নেই। পদত্যাগের নেপথ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কী ঘটেছে, তা সময়ই সবচেয়ে ভালোভাবে বলে দেবে।

 

ইশরাকের এই পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির হাইকমান্ড এবং দলের শীর্ষপর্যায়েও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এই বিষয়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, মূলত কঠোর দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ইশরাককে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। একে মেয়র পদে প্রার্থী করার কোনো পূর্বনির্ধারিত কৌশল হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। নির্বাচন তো এখনো অনেক দূরের বিষয়, দল যদি সত্যিই এমন কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা করত, তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক আগমুহূর্তেও তাকে পদত্যাগ করতে বলা যেত। তিনি আরও যোগ করেন, ইশরাক একজন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ নেতা। দলের জন্য আত্মনিবেদিত হয়ে কাজ করলে ভবিষ্যতে তার ওপর আরও অনেক বড় ও গুরুদায়িত্ব অর্পিত হতে পারে।

 

এদিকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দলের ভেতরে বর্তমানে একাধিক পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসক মো. আবদুস সালাম এবং ইশরাক হোসেনের মধ্যকার সমীকরণ বেশ জটিল। এর পাশাপাশি মির্জা আব্বাস ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের অনুসারী আরেকটি শক্তিশালী পক্ষও মাঠে সক্রিয় রয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ও বিভক্তি আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় ধরনের কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগ পুরোপুরি লুফে নেওয়ার চেষ্টা করবে। আবদুস সালাম ইতোমধ্যে প্রশাসকের চেয়ারে বসে মেয়র নির্বাচনের জন্য নিভৃতে নিজের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছেন, আর অন্যদিকে মন্ত্রিত্বের জালে আটকা পড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়া ইশরাক এবার মুক্ত বাতাসে পুরোদমে মাঠে নামার সুযোগ পেলেন। শেষ পর্যন্ত কে দলীয় মনোনয়ন পাবেন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে, তবে মাঠের প্রস্তুতি এখন থেকেই জোরালো করতে হবে।

 

বহু আগে থেকেই দক্ষিণ সিটিতে মেয়র হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের তীব্র আগ্রহের কথা প্রকাশ করে আসছেন ইশরাক হোসেন। পদত্যাগের পরপরই তিনি সংবাদমাধ্যমকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি মেয়র পদের নির্বাচনের জন্য একশ ভাগ প্রস্তুত রয়েছেন। দল যদি শেষ পর্যন্ত অন্য কাউকেও প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে মনোনয়ন দেয়, তবে তাকে বিজয়ী করতেও তিনি সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করবেন। কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি বিচলিত হবেন না এবং সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজপথে ও জনগণের সেবায় কাজ চালিয়ে যাবেন।

 

৩৯ বছর বয়সী ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে রয়েছে তার পারিবারিক ঐতিহ্য এবং রাজপথের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। তার পিতা অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী ও কিংবদন্তি নেতা। পুরান ঢাকায় তার পরিবারের যে আধিপত্য ও শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল, তার ওপর ভর করেই ইশরাক ২০১৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনীতিতে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার সরব উপস্থিতি তাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে দারুণ জনপ্রিয় করে তোলে। ২০২০ সালের ডিএসসিসি নির্বাচনে তিনি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়াই করেন। যদিও পরবর্তী সময়ে আইনি লড়াই এবং ২০২৫ সালের মার্চে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক তাকে মেয়র ঘোষণা করার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধিতার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত শপথ নিতে পারেননি।

 

এছাড়া ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে পুলিশের লাঠিপেটার মুখে আহত এক দলীয় কর্মীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে পুলিশি বেষ্টনী থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেই সাহসিকতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তাকে রাতারাতি আলোচনার শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। জীবন বাজি রেখে দলীয় কর্মীকে রক্ষার সেই ঘটনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছিল। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিনও তার এই পদত্যাগকে একটি ঐতিহাসিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করে মন্তব্য করেছেন যে, এটি কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং ভবিষ্যতে ইশরাকের জন্য আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সব মিলিয়ে মন্ত্রিত্বের অধ্যায় চুকিয়ে ইশরাক হোসেন এখন নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করেছেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর