ঐতিহাসিক
জুলাই জাতীয় সনদ পাসের এক বছর পূর্ণ
হলেও এর বাস্তবায়ন কাঠামো
নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছে না বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায়
থাকা বিএনপি এবং বিরোধী জোটে থাকা জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক
পার্টি (এনসিপি)। নতুন ত্রয়োদশ
জাতীয় সংসদের শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের
সঠিক পথ নির্ধারণে দুপক্ষ
দৃশ্যত দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে।
মূল
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত প্রক্রিয়া পরিচালনার পদ্ধতি। বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই গণভোটের রায় অনুযায়ী একটি স্বাধীন 'সংবিধান সংস্কার পরিষদ' গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে সরকার সেই পরিষদের বদলে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে স্পষ্ট
‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করছে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা।
এনসিপির
যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা নিজেদের বারবার বঞ্চিত ও প্রতারিত মনে
করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদে গণভোটে জনগণের দেওয়া স্পস্ট রায় নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দল
একত্রে বসে আরও পর্যালোচনার সুযোগ ছিল। সেটির মাধ্যমে সিদ্ধান্তটির এক ধরণের গণবৈধতা
তৈরি হতে পারত। কিন্তু বর্তমান সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে এই পুরো প্রক্রিয়ার
আইনি ও নৈতিক বৈধতা
বিনষ্ট হচ্ছে।
একই
ইস্যুতে তীব্র সমালোচনা তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি অভিযোগ করেন যে, শুরু থেকেই বিএনপির মূল আচরণের মধ্যে জুলাই সনদের মূল চেতনা ধারণ করার কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি। জুবায়ের সিনিয়র বিএনপি নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের একটি
বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেন, বিএনপি কেবল নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার ভয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কৌশলগত কারণে এসব মেনে নিয়েছিল, কিন্তু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেনি। সাধারণ মানুষ এই কৌশলকে সাধারণ
নাগরিকদের সাথে এক ধরণের প্রতারণা
হিসেবে দেখছে।
অবশ্য
প্রথাগত আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে
জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনসহ সনদের মোট ৯টি সংস্কার সিদ্ধান্তের ওপর বিএনপির পক্ষ থেকে শুরু থেকেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা
ভিন্নমত ছিল। বিএনপি তাদের অবস্থান ধরে রেখে জানিয়েছে, বিরোধীরা অহেতুক জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
অন্যদিকে
বিরোধীদের সব অভিযোগ নাকচ
করে দিয়ে সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, জুলাই সনদ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সই হয়েছিল এবং
এতে অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি বিষয় সংশোধনী আকারে সংসদে এনে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, গঠিত বিশেষ কমিটির দায়িত্ব শুধু সুপারিশ তৈরি করে সংসদে জমা দেওয়া। কমিটির সুপারিশ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা নিয়ে সংসদ
কক্ষে খোলামেলা বিতর্ক ও বিশ্লেষণ হবে।
অবশেষে কোনো বিষয়টি গ্রহণ বা বর্জন করা
হবে, তা নির্ধারণ করবে
সার্বভৌম জাতীয় সংসদ।
রাজনৈতিক
দলগুলোর এই টানাপোড়েনের মধ্যে
পুরো বাস্তবায়ন পদ্ধতির সঠিকতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক সংবিধান
সংস্কার কমিশন প্রধান প্রফেসর আলী রীয়াজ। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন যদি কোনো পক্ষ সেই প্রক্রিয়াকেই পুরোপুরি অস্বীকার করে বা তা থেকে
বিচ্যুত হয়, তবে দেশকে এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব। নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়াকে তিনি
এক দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি হিসেবে অভিহিত করেন।
উল্লেখ্য,
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক
সংলাপ ও বিতর্কের পর
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে
সই হয়েছিল ঐতিহাসিক জুলাই সনদ। পরবর্তীতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি
অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোটার
সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দেন। নির্বাচনের পর জামায়াতসহ বিরোধী
দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ ও সংস্কার পরিষদ—উভয় পদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি সংসদ সদস্যরা কেবল এমপি হিসেবেই শপথ গ্রহণ করেন।