ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় ঐক্য ধরে রেখে প্রতিটি এলাকায় একজন করে প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে তৃণমূলের মতামত, প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জয়ের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে মনোনয়নপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কেউ প্রার্থী হলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর বার্তাও দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন পর্ব শুরু হতে যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। আগামী ২১ জানুয়ারি এ ভোট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণার পরপরই নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। তবে তৃণমূল পর্যায়ে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দলীয় কোন্দল এড়িয়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করাই দলটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দলীয় সূত্রে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদেরও প্রতিটি ইউনিয়নে সমন্বয়ের মাধ্যমে একজন প্রার্থী নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাতে বলা হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তৃণমূল ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বারবার বার্তা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিটি এলাকায় একজন করে প্রার্থী থাকেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, দলের শৃঙ্খলা না মেনে কিংবা গায়ের জোরে কেউ প্রার্থী হতে চাইলে তাঁকে পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে হবে। দল এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য মঙ্গলজনক হবে না। তাই প্রার্থী হওয়ার আগে দলীয় সিদ্ধান্ত ও শৃঙ্খলার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
তবে একক প্রার্থী নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে বিএনপি। প্রার্থীর সাংগঠনিক ভূমিকা, এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, যাঁর জয়ের সম্ভাবনা বেশি, তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে দলের জন্য প্রার্থীর ত্যাগ, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। তবে অতীতের অবদানই একমাত্র বিবেচ্য হবে না; সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থান ও জনসমর্থনও যাচাই করা প্রয়োজন।
বিএনপির এই মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাংগঠনিক পদ ও স্থানীয় জনপ্রিয়তাকে কীভাবে সমন্বয় করা হবে। কোনো নেতা দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও তাঁর নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা সীমিত হতে পারে। আবার কেউ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে না থেকেও সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেন।
রুহুল কবির রিজভী এ বিষয়ে জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তি সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হলেই তাঁর পুরো এলাকায় জনপ্রিয়তা রয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি এলাকায় জনপ্রিয় হলেও দলের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে না থাকতে পারেন। কেউ হয়তো দলের সদস্য, সহসম্পাদক কিংবা সাধারণ সমর্থক হিসেবে কাজ করছেন। পদমর্যাদা কম হলেও তাঁর সক্রিয়তা ও জনসমর্থন বিবেচনায় দলীয় সমর্থন পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এ কারণে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় দলের সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের মতামত যাচাই, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ এবং জয়ের সম্ভাবনা মূল্যায়নের মাধ্যমে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করাই বিএনপির লক্ষ্য।
তবে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দিলে তা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রধান লক্ষ্য একদিকে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থী নির্বাচন, অন্যদিকে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বার্তা দিয়েছে নেতৃত্ব। এখন মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় এসব নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের ঐকমত্য কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতির সফলতা।