দুর্গাপূজার আনন্দে শহরকে বর্ণিল আলো ও রঙে সাজাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পথচারী ও চালকদের চোখের সৌন্দর্য বাড়াতে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী চিংড়িঘাটা ও গড়িয়াহাট উড়ালসড়কে আঁকা হয়েছিল নানা রঙের আলপনা। কিন্তু উৎসবের আনন্দ ঘনিয়ে আসার আগেই সেই আলপনা যেন পরিণত হয়েছে মারাত্মক এক ফাঁদে। কালো পিচের ওপর ফুটানো রঙিন প্রলেপ আর হালকা বৃষ্টি—দুয়ে মিলে সড়ক হয়ে উঠেছে তাশ খেলার মতো বিপজ্জনক। ইতোমধ্যে পর পর বেশ কয়েকটি মোটরবাইক পিছলে পড়ে যাওয়ার গা ছমছমে দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে তোলপাড়। সৌন্দর্য বর্ধনের নামে চালকদের জীবন এভাবে ঝুঁকিতে ফেলার এই উদ্যোগ নিয়ে এখন আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে পুরো রাজ্যজুড়ে।
কলকাতা পুরনিগম ও হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনার্স (এইচআরবিসি)-এর যৌথ উদ্যোগে এবং দুটি বেসরকারি রঙ প্রস্তুতকারী সংস্থার সহায়তায় এই সাজসজ্জার কাজ করা হয়েছিল। শুধু তিলোত্তমা কলকাতাতেই নয়, এই ট্রেন্ড রাতারাতি ছড়িয়ে পড়েছিল আসানসোলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, হালকা বৃষ্টির মধ্যে চিংড়িঘাটা ফ্লাইওভার দিয়ে যাওয়ার সময় পর পর কয়েকটি মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিছলে পড়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনা দেখে বিরোধী রাজনৈতিক দল সিপিআইএম ও তৃণমূল কংগ্রেস এই ভিডিওটি শেয়ার করে রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে।
রাজনৈতিক উত্তাপের সাথে সাথে সামনে এসেছে পূর্ব সতর্কবার্তার বিষয়ও। কংগ্রেসের দাবি, তারা আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করলেও প্রশাসন তাতে কোনো কান দেয়নি। প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় ইতিপূর্বেই নগরোন্নয়ন মন্ত্রী এবং কলকাতা পৌরসভার কমিশনারকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, তেল-ভিত্তিক রঙের স্কিড প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তা চালকদের জন্য চরম বিপজ্জনক হতে পারে। দুর্ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এটা ঘটারই ছিল। মূল রাস্তা মেরামত না করে কেবল রঙ করতে ব্যস্ত ছিল প্রশাসন।’
তবে তীব্র সমালোচনার মুখেও নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটেননি নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। যুক্তি দিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘এটি কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে আমরা আলপনা এঁকেছি, যা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অঙ্গ। বিশ্বের বহু দেশেই সৌন্দর্য বাড়াতে এমন কাজ করা হয়। তাছাড়া, রাস্তায় যে রঙ ব্যবহার করা হয়েছে তা কোনো সাধারণ তেল রঙ নয়, এটি সম্পূর্ণ পিছলে যাওয়া রোধী বিশেষ রঙ।’ তিনি আরও জানান, ঠিক কী কারণে বাইকগুলো পিছলে গিয়েছে—বৃষ্টির জল নাকি অন্য কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি, তা খতিয়ে দেখতে কেএমডিএ-র প্রকৌশলী, সিইও, কলকাতা পুলিশ কমিশনার, ডিজিপি এবং পিডব্লিউডি-র একটি যৌথ টিম সরেজমিনে কাজ করছে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিংড়িঘাটা ফ্লাইওভারে ‘হার্ড টার্নিং’ বা বিপজ্জনক বাঁক থাকার কারণে এমনটা ঘটতে পারে। তবে চালকদের নিরাপত্তার খাতিরে আপাতত ওই উড়ালসড়কে মোটরবাইক চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারে বড় কোনো দুর্ঘটনার খবর মেলেনি বলে দাবি করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য না জেনে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।
কলকাতায় যখন এই বিতর্ক তুঙ্গে, তখন আসানসোলের ভগৎ সিং মোড় এলাকায় দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন দৃশ্য। রাতেরবেলা রাস্তায় রঙ করার পরদিন সকালেই স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দমকলের গাড়ি এনে পানি দিয়ে সেই রঙের প্রলেপ ধুয়ে তুলে ফেলেন সংশ্লিষ্ট রঙ প্রস্তুতকারী সংস্থার কর্মীরা।