ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর তাইজের আশপাশে সামরিক অবস্থান জোরদার করছে হুথি বিদ্রোহীরা। শহরটির কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেবেল সবর পাহাড়ের দিকে যাওয়ার একাধিক জেলা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি উঠেছে তাদের অগ্রগতি ঘিরে। পাহাড়টির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তাইজের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি বাহিনীর চলাচলের ওপর নজরদারির সুবিধা পেতে পারে হুথিরা। একই সঙ্গে শহরটি ঘিরে ফেলার প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে ইয়েমেনের তাইজ অঞ্চলে হুথিদের সামরিক অগ্রগতির এ তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার কৌশল নিয়েছে হুথিরা।
জেবেল সবর পাহাড় তাইজ শহরের ওপর কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়টির ওপর থেকে শহরের বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। ফলে এই উচ্চভূমির নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা শহরের বিভিন্ন সড়ক এবং সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণে বাড়তি সুবিধা পাবে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিরা জেবেল সবরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে তাইজের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এবং সরকারি বাহিনীর সেনাদের চলাচলের ওপর নজর রাখার সুযোগ পাবে। এতে সরাসরি শহরের ভেতরে প্রবেশ না করেও সামরিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে। পাহাড়টির অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান লড়াইয়ে এটি অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
এদিকে তাইজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। ওই এলাকায় হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড পুনর্দখলের চেষ্টা করছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। এই অভিযানে সৌদি আরবের বিমানবাহিনীর সহায়তা পাচ্ছে তারা। হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি বিমানবাহিনী নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। উভয় পক্ষের সামরিক তৎপরতার মধ্যে তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শহরটির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও আশপাশের এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সংঘাতের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত থাকায় তাইজের মানবিক পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। শহরের বাসিন্দাদের কাছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে। এতে খাদ্যসংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাব আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, তাইজে আটা ও ময়দার মজুত খুবই সীমিত হয়ে এসেছে। রান্নার গ্যাসের সংকট রয়েছে এবং জ্বালানির দামও ক্রমাগত বাড়ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এসব সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। বিশেষ করে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন সংঘাতকবলিত এলাকার বাসিন্দারা।
এমন পরিস্থিতিতে তাইজে অবস্থানরত সরকারি বাহিনীর সদস্যদের শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে হুথিরা। তবে সেই আহ্বানের পরও এলাকায় সংঘর্ষ থামেনি। বরং গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
তাইজ শহরটি যদি শেষ পর্যন্ত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনের সরকারের জন্য তা বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক ধাক্কা হবে। শহরটির কৌশলগত অবস্থান এবং চলমান সংঘাতের গুরুত্ব বিবেচনায় তাইজের পরিস্থিতি ইয়েমেনের সামগ্রিক যুদ্ধের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা