মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে মান্দালয় শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়েসাগিও এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় তিনটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শী। দেশটিতে সামরিক শাসনবিরোধী সংঘাত চলার মধ্যে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) স্থানীয় এক বিদ্রোহী যোদ্ধার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি। হামলাটি ঘটেছে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের (পিডিএফ) নিয়ন্ত্রণাধীন একটি এলাকায়। শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে সামরিক বাহিনীর বিমান থেকে হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সদস্য বো পাও।
বো পাওয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১১ জনের মধ্যে ছয়জন নারী ও দুজন শিশু রয়েছে। নিহতদের মধ্যে মাত্র এক বছর বয়সী একটি শিশুও ছিল, যে সম্প্রতি হাঁটতে শিখেছিল। হামলার সময় ওই এলাকায় থাকা সাধারণ মানুষই প্রাণ হারিয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সূত্র।
হামলার পর ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বর্ণনা করেছেন নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানান, রাস্তার পাশে থাকা তিনটি বাড়ি বোমার আঘাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বাড়িগুলোতে হামলার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরও বলেন, নিহতদের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় প্রাণ হারানো ১১ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রও রয়েছে। হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে হামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এএফপি। তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার লক্ষ্যবস্তু, সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য এবং হতাহতের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য সীমিত রয়েছে।
মিয়ানমারে ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে। অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসনের বিরোধিতায় বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এর মধ্যে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের যোদ্ধারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতাকারী বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গোষ্ঠীও দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে পিডিএফের যোদ্ধারাও বিভিন্ন এলাকায় সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছেন। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘর্ষ, বিমান হামলা ও বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত রয়েছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এক লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অতীতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমানে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের আশপাশে পিডিএফের যোদ্ধারা কিছুটা চাপের মুখে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ইয়েসাগিও এলাকায় বিমান হামলা ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
দেশটির সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাণহানি বন্ধ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সর্বশেষ হামলার বিষয়ে মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।
সূত্র: এএফপি