নির্বাচনোত্তর সরকারের নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার খুলনা ও মোংলা সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের এই গুরুত্বপূর্ণ সফরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্থায়ী নদীভাঙন, ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ এবং চরম যোগাযোগ সংকটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে আসা উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার প্রায় তিন লাখ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় নতুন করে বুক বাঁধছেন। তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও অমীমাংসিত সংকটের অবসান ঘটবে—এমনটাই এখন তাদের একমাত্র বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।
সুন্দরবনঘেঁষা তিনটি পৃথক দ্বীপ নিয়ে গঠিত অত্যন্ত দুর্গম এই জনপদে যাতায়াত এবং জীবনজীবিকা সবসময়ই এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। চালনা পৌরসভাসহ উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারাচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ষাটের দশকের নির্মিত ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারের বেড়িবাঁধগুলোর বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে ৩১ নম্বর পোল্ডারের প্রায় ৪৮ কিলোমিটার বাঁধ যুগের পর যুগ সংস্কার না হওয়ায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ প্রতিনিয়ত চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন। আইলার মতো প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই খোনা, লক্ষ্মীখোলা, পানখালী ফেরিঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে তীব্র নদীভাঙন স্থানীয়দের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। ভুক্তভোগী কৃষ্ণপদ সরদারের মতো হাজারো মানুষ নদীগর্ভে সর্বস্ব হারিয়ে এখন বেড়িবাঁধের ওপর ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ত্রাণ নয়, তাদের প্রধান দাবি সুপেয় পানি এবং যুগোপযোগী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ।
উপকূলীয় এই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের আরেকটি বড় যন্ত্রণার নাম অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। জেলা শহর খুলনার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝপঝপিয়া, ঢাকী ও চুনকুড়ি নদী। স্থানীয় বাসিন্দারা এই তিনটি নদীর ওপর অবিলম্বে সেতু নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে পানখালী-বরণপাড়ার মধ্যবর্তী ঝপঝপিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মিত হলে পুরো অঞ্চলের চিত্র বদলে যাবে। পাশাপাশি বেকারত্ব দূর করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিও রয়েছে। সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির আশা প্রকাশ করেছেন যে, নলিয়ানে প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে টেকসই বাঁধ ও সেতু নির্মাণের স্থায়ী সমাধান মিলবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে এই এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, নদীর ওপর সেতু ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছেন। এছাড়া দাকোপে পর্যটনশিল্প স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সফল করতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ থেকে ছয় স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে হেলিপ্যাড স্থাপন এবং নলিয়ান লঞ্চঘাট পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের কাজ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে, আনুষ্ঠানিক আশ্বাসের বাইরে নদীভাঙন থেকে রক্ষা, সুপেয় পানির নিশ্চয়তা এবং উন্নত যোগাযোগের বাস্তব রূপ দেখতে উদগ্রীব হয়ে আছেন দাকোপের সাধারণ মানুষ।