আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষয়িষ্ণু ইউক্রেন সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে এক বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মঞ্চে বহুল প্রতীক্ষিত এই সংঘাত বন্ধের উদ্দেশ্যে আগামী মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সাথে যৌথভাবে ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রাশিয়ার ঐতিহাসিক শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর ক্রেমলিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ও সম্মতির কথা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও পুতিনের এই ইতিবাচক উদ্যোগকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে আগামী নভেম্বরের শুরুতেই আলোচনা সভাটি আয়োজনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘এবিসি নিউজ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে, সেন্ট পিটার্সবার্গের কনস্টানটাইন প্যালেসে আয়োজিত এই হেভিওয়েট বৈঠকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পাশাপাশি তার জ্যেষ্ঠ পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ এবং বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবশালী জামাতা জ্যারেড কুশনারও আলোচনায় সরাসরি যুক্ত হন। মূলত ইউক্রেন সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পরবর্তী সময়ে কীভাবে উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেই মূল কাঠামোর ওপরই আলোচনায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ ক্রেমলিন বৈঠকের পূর্বে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা চালিয়েছিলেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। বৈঠক শেষে ক্রেমলিন থেকে জানানো হয় যে, অসলোর পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবগুলো রাশিয়ার জন্য শতভাগ সন্তোষজনক না হলেও, এটি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে স্থায়ী সমাধান প্রক্রিয়ার দিকে এগোনোর জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিয়েভের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাবকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, কিয়েভ যেকোনো ধরনের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ এবং যেকোনো মানবিক সহায়তা উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। এমনকি আগামী নভেম্বরের প্রথম দিকেই প্রতিনিধি দলীয় পর্যায়ে এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি আয়োজনে কিয়েভ সব ধরনের প্রস্তুতি নিবে।
বৈঠককালে প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধকালীন তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করার পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল পাঠানোর বিশেষ সুযোগ দেওয়ায় মার্কিন দূত উইটকফ স্বয়ং পুতিনকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাছাড়া পুতিন এই বৈঠকে বিশেষ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চরম সামরিক সংঘাত প্রশমনে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের ওপর থাকা তার রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগাতে পুরোপুরি তৈরি।
তবে একদিকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা ও আগামী মাসের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ইতিবাচক প্রস্তুতির খবর এলেও, অন্যদিকে রণক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয় থামেনি। কিয়েভ অঞ্চলের স্থানীয় ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, আলোচনার খবরের মধ্যেই তাদের রাজধানী কিয়েভে প্রাণঘাতী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে নতুন করে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে অন্তত ৬ জন গুরুতর আহত হওয়া ছাড়াও একাধিক আবাসিক বাড়িঘর ও সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বিপরীতে, রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর দিকে ধেয়ে আসা ইউক্রেনের প্রায় ৬৩০টি ড্রোনের বিশাল বহরের বেশিরভাগই সফলভাবে আকাশেই ভূপাতিত করার পাল্টা দাবি করেছে রুশ সামরিক কর্তৃপক্ষ। সূত্র: এবিসি নিউজ