সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 11
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে ও প্রতারণার মাধ্যমে এক মানসিক ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধের ১৪ শতক ফসলি জমি নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের বাঘলপুর গ্রামে ঘটেছে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি। ভুক্তভোগী বৃদ্ধের পরিবারের অভিযোগ, কয়ড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও তার দুই ভাই মিলে অসহায় এই বৃদ্ধকে ছলচাতুরীর ফাঁদে ফেলে সর্বস্বান্ত করেছেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী ৮৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ আজিজুল হক বাঘলপুর গ্রামের মৃত মফিজ সরকারের ছেলে। তিনি একদিকে যেমন মানসিক প্রতিবন্ধী, অন্যদিকে বর্তমানে চোখেও দেখতে পান না। অভিযুক্তরা হলেন একই গ্রামের মৃত ময়নাল হক সরকারের ছেলে কয়ড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আবুল কালাম, তার ভাই শাহ আলম ও শাহাদাৎ হোসেন, যারা সম্পর্কে বৃদ্ধের চাচাতো ভাই। ভুক্তভোগী বৃদ্ধের ছেলে মো. ফারুক সরকার অভিযোগ করে জানান, তাদের বসতবাড়ি ছাড়া বর্তমানে ক্রয় ও রেকর্ড সূত্রে মাত্র ২৩ শতক ফসলি জমি অবশিষ্ট রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালামের নেতৃত্বে তার ভাইয়েরা মিলে বৃদ্ধ আজিজুল হককে বয়স্ক ভাতার কার্ড তৈরি করে দেওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে কৌশলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবার জানতে পারে, ভাতার কার্ড নয়, বরং উল্লাপাড়ার ঝিকিড়া মহল্লার একটি বাড়িতে নিয়ে বুঝিয়ে দলিলে টিপসই নিয়ে ওই দিনই ১৪ শতক জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্যমতে, জমি রেজিস্ট্রি করার আগে বৃদ্ধ আজিজুল হকের হাতে ভাতার টাকা হিসেবে মাত্র ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় যেখানে টিপসই দিতে বলা হয়েছিল, সেখানেই সরল বিশ্বাসে টিপসই দিয়ে দেন। প্রতারণার বিষয়টি উন্মোচিত হওয়ার পর পরিবারটির পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম দাবি করেছেন, ৭ লাখ টাকা পরিশোধ করে বৃদ্ধ চাচার সম্মতিতেই নিয়ম অনুযায়ী জমি কেনা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক আবদুল মতিন জানান, জমি বিক্রেতা যে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন তা তিনি আগে জানতেন না এবং ক্রেতাদের জমা দেওয়া কাগজপত্র দেখেই দলিল লিখেছেন। পরবর্তীতে সত্যতা জানতে পেরে নিজের ভুলের অনুশোচনা প্রকাশ করেন তিনি। অন্যদিকে উল্লাপাড়ার সাব-রেজিস্ট্রার ফারহানা আজিজ জানান, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সনদের ভিত্তিতে কমিশনে অফিস কর্মী প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে চক্রান্তের কথা জানতে পেরে দলিল লেখক আবদুল মতিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং সঠিক জবাব না দেওয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে যাওয়া অফিস কর্মী আবদুল্লাহ আল নাঈম জানান, ঝিকিড়া মহল্লার একটি বাড়িতে বৃদ্ধকে নিয়মমাফিক প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেওয়ায় টিপসই নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে অভিযোগের পর প্রকৃত ঘটনা জানা গেছে। সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম জানিয়েছেন, মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের জমি অবৈধভাবে লিখে নেওয়ার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। সরকারি ছুটি শেষ হলেই কার্যালয় খোলার সাথে সাথে এই ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।