বগুড়া প্রতিনিধি
মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান—দেশের এই তিন ঐতিহাসিক অর্জনের মূল ট্রফিই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঘরে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার ১৬১ জন শিক্ষকের সাথে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে গতানুগতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে শিক্ষকদের ভাবনা, সংকট ও প্রস্তাব সরাসরি শুনতেই এই ব্যতিক্রমী মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা এ মতবিনিময় সভা চলে।
সভায় শিবগঞ্জ ও মোকামতলার শিক্ষকদের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে এ ১৬১ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছিল। নির্বাচিত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জাইমা রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর ছবি সংবলিত মগ উপহার দেন প্রতিমন্ত্রী। সভায় শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভূমিকা, শিক্ষার নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা এবং তা থেকে উত্তরণের পথ নিয়ে বিষদ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সব পেশার মানুষ গড়ার কারিগর হলেন শিক্ষকরা। অথচ আমাদের দেশে এ শিক্ষক সমাজই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। দীর্ঘকাল দেশে দেশপ্রেমিক সরকার ক্ষমতায় না থাকায় এই অবহেলার মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। তিনি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার আগ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা অনুরোধ জানালেও তিনি রাজি হননি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন, ১৯৭২ সালে গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার নিজেই জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণাকে স্বীকৃতি দিয়ে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ফলে বর্তমানে ৭ মার্চের ভাষণকে স্বাধীনতার মূল ঘোষণা দাবি করা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হাস্যকর।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশকে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ করার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এসে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সমালোচনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের মধ্য দিয়েই দেশে রাজনৈতিক স্বৈরাচারের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে রূপ নেয়। দীর্ঘদিনের সেই সংকট কাটিয়ে দেশকে আধুনিক ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর বর্তেছে।
দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিসংখ্যান টেনে মীর শাহে আলম বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের সময় রিজার্ভ ছিল মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার। পরে ড. ইউনূস তা টেনেটুনে ২৬ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে আসেন। কিন্তু আমাদের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশের রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
জ্বালানি সংকটের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে তেল ও গ্যাসের সংকটকে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের একটি চক্র পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চালিয়েছিল। তারা ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির কৃত্রিম দীর্ঘ লাইন দেখিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রচার করায়। তেলের দাম সামান্য সমন্বয়ের পর মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়, যা প্রমাণ করে পুরো বিষয়টিই চক্রান্ত ছিল।
জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপির অবদান ও ইতিহাস পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে নিজে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির বড় ভূমিকার সাথে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগেরও অবদান ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানেও বিএনপি ও জামায়াতের অসামান্য অবদান রয়েছে। এমনকি জামায়াতের আমীরও তারেক রহমানকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে স্বীকার করেছেন। সুতরাং, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ট্রফি, ৯০-এর ট্রফি এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ট্রফি—তিনটি ঐতিহাসিক ট্রফিই বিএনপির ঘরে রয়েছে। এমন একটি জনপ্রিয় দলকে পতনের হুমকি দিয়ে লাভ হবে না।
বক্তব্যের শেষভাগে শিক্ষকদের উদ্দেশে সামাজিক দায়িত্ব পালনের উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের কাজ কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমিত রাখা চলবে না। সমাজের অনিয়ম, অন্যায় ও অপরিচ্ছন্নতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানবিক ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের নেতৃত্বেই গড়ে তুলতে হবে নতুন সামাজিক আন্দোলন।