বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি সাইবার অপরাধের ধরনেও আসছে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। সম্প্রতি সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আগাম সাইবার হামলার অনুকরণ বা মহড়া চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। দেশটির শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া শুক্রবার এ সংক্রান্ত এক বিশেষ দল গঠনের চূড়ান্ত উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। প্রযুক্তি ব্যবস্থার ভেতরের মারাত্মক দুর্বলতাগুলো আগেভাগেই শনাক্ত করা এবং তা দ্রুত সমাধান করার মাধ্যমে সম্ভাব্য বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধ করাই এ যুগান্তকারী কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।
সম্প্রতি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির গুরুতর ও গভীর নিরাপত্তা ত্রুটির তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে এক চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা জানান, এই নিরাপত্তা ত্রুটির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্র লাখ লাখ বার আক্রমণের অপচেষ্টা চালায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে বিশ্বব্যাপী ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করে এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে তাদের অনলাইন সেবা কার্যক্রম স্থগিত রাখে।
জাপানের অন্যতম শীর্ষ ও তৃতীয় বৃহত্তম মুঠোফোন অপারেটর সফটব্যাংক তাদের মূল নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলায় আপৎকালীন ও জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে। এর ফলে সাময়িকভাবে তাদের গ্রাহকেরা ভূমিকম্প, সুনামি কিংবা মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগসংক্রান্ত আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। তবে সফটব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ৩ কোটির বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী গ্রাহক ইয়াহুর একটি বিশেষ অ্যাপসহ অন্যান্য বিকল্প সেবার মাধ্যমে যথারীতি ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পাওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জাপানে প্রায়শই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে এবং দেশটি বিশ্বের অন্যতম চরম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।
জাপানের শিল্পমন্ত্রী রিওসেই আকাজাওয়া গণমাধ্যমকে জানান, নিরাপত্তা কাঠামোর সামান্যতম দুর্বল ফাঁক গলেই হামলাকারীরা সফল হতে পারে। তাই বর্তমান যুগে চিন্তা-ভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি এবং হামলাকারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নিরাপত্তা বিষয়টিকে মূল্যায়ন করতে হবে। যারা মূলত নিরাপত্তা সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, তাদেরও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং আগেভাগে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে হামলাকারীদের চেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে অন্তত এক ধাপ এগিয়ে থাকা সম্ভব হয়।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপকে কিছুটা ধীরগতির বলে সমালোচনা করেছেন টোকিওভিত্তিক নামজাদা সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডজে করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তা নোবুও মিওয়া। বর্তমান প্রেক্ষাপটে টোকিও থেকে ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থিক ব্যাংক, বিমান সংস্থা, রেলযোগাযোগ, কর বিভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবার ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে স্তব্ধ রাখা হয়। কয়েক দশক ধরে গোটা ইন্টারনেট ব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যবহৃত প্রযুক্তির ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমুখী সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা এখন বিভিন্ন সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে মারাত্মক প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি পর্যন্ত বহু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করছে। এতে করে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ অত্যন্ত দ্রুত, কম খরচে এবং সহজে ধরা না পড়ার মতো জটিল রূপ ধারণ করছে। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নির্মাতারা ইতিমধ্যেই তাদের দীর্ঘদিনের পুরোনো নিরাপত্তা ত্রুটিগুলোর সমাধান উন্মোচন করে ব্যবহারকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে সফটওয়্যার হালনাগাদ করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।