করোনাভাইরাসের ভয়াবহ বৈশ্বিক ট্রমা এবং দীর্ঘ মহামারির ক্ষত মানুষের মন থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে নতুন এক ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত বিভিন্ন ধরনের গবাদি পশুর শরীরে প্রজননজনিত সংক্রমণ ঘটানো 'শামোন্ডা ভাইরাস' এবার আশঙ্কাজনকভাবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরেও শনাক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে ষাটোর্ধ্ব এক প্রবীণ ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার চিকিৎসাধীন শরীরে এই পশুবাহিত মারাত্মক ভাইরাসের স্পষ্ট উপস্থিতি পাওয়ার পর থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক শীর্ষ স্বাস্থ্য মহলে গভীর চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। এই ঘটনার পর থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মারাত্মক প্রশ্ন উঠেছে—গবাদি পশুর প্রজনন ধ্বংসকারী এই ভাইরাসটি কি শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য ভয়াবহ কোনো বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিতে যাচ্ছে?
বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, শামোন্ডা ভাইরাস মূলত 'অর্থোবুনিয়াভাইরাস' গোত্রের একটি বিপজ্জনক কীটপতঙ্গবাহিত ভাইরাস, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে সিম্বু সেরোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়ার একটি গবাদি পশুর খামারে প্রাণীদের শরীরে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছিল। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এটি প্রধানত আফ্রিকা, এশিয়া এবং সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রধানত গরু, ছাগল, ভেড়া ও ঘোড়ার মতো গৃহপালিত পশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
সাধারণত চারণভূমিতে থাকা বিষাক্ত মশা বা রক্তচোষা ক্ষুদ্র পতঙ্গের কামড়ের মাধ্যমে পশুর শরীরের রক্তে এই ভাইরাস ছড়ায়। পশুর শরীরে এর মারাত্মক সংক্রমণে উচ্চ জ্বর, তীব্র ডায়রিয়া, হঠাৎ ক্ষুধামন্দা, দুধ উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া এবং গাভীর গর্ভপাত বা জন্মগত বিকলাঙ্গতার মতো প্রজননজনিত অত্যন্ত জটিল সমস্যা দেখা দেয়।
ইতিহাসে এই প্রথম ইউরোপের ফ্রান্সে কোনো মানুষের শরীরে শামোন্ডা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ষাটোর্ধ্ব ওই ব্যক্তি আগে থেকেই গুরুতর শারীরিক জটিলতা এবং মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীনতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকরা জানান, মৃত্যুর আগে তার মস্তিষ্কে যে জটিল স্নায়বিক প্রদাহ দেখা দিয়েছিল, তার পেছনে এই ভাইরাসের সংযোগ রয়েছে বলে প্রবল ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই ব্যক্তির শরীরে ঠিক কীভাবে ভাইরাসটি প্রবেশ করল, তা নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না গবেষকরা। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্ত কোনো পোকা বা মশার সরাসরি কামড়েই তার শরীরে এই বিরল সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে।
শামোন্ডা ভাইরাস মানুষের শরীরে শনাক্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগ বাড়লেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে করোনাভাইরাসের মতো ভয়াবহ মহামারি বা অতিমারির সঙ্গে তুলনা করতে নারাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনাভাইরাস যেভাবে খুব সহজে ও দ্রুত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এক মানুষের দেহ থেকে অন্য মানুষের দেহে বায়ুবাহিত উপায়ে ছড়াত, শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রে তেমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি।
এটি মূলত পশুবাহিত রোগ এবং শুধুমাত্র আক্রান্ত পতঙ্গের কামড়েই ছড়ায়। এখন পর্যন্ত মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে এই ভাইরাস ছড়ানোর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে আতঙ্কিত না হয়ে এটিকে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে দেখছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা।