ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ক্রিকেটে আচমকাই বড় ধরনের রদবদল এসেছে। ঘরের মাঠে আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজকে সামনে রেখে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশের ক্রিকেটের একসময়ের বর্ণিল তারকা মোহাম্মদ আশরাফুলকে। তার পরিবর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাবেন অভিজ্ঞ কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। হঠাৎ কেন এই পরিবর্তন এবং পর্দার আড়লে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ থেকে মোহাম্মদ আশরাফুলকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তের পরপরই জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অফিশিয়াল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ছেড়ে ‘থ্যাংক ইউ’ বার্তা পাঠান সাবেক এই সফল অধিনায়ক। পরবর্তীতে ক্রিকেটভিত্তিক জনপ্রিয় পোর্টাল ক্রিকবাজের সঙ্গে আলাপকালে আশরাফুল নিজেই জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তিনি বর্তমানে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্বের অপেক্ষায় আছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। তার কোচিং ক্যারিয়ারের এই অধ্যায়ে বাংলাদেশ দল বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আশরাফুলের অধীনে দল সব মিলিয়ে আটটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে পাঁচটিতে জয়, একটিতে ড্র এবং মাত্র দুটিতে পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। তার সময়কালেই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে দারুণ এক টেস্ট সিরিজ জয় পায় টাইগাররা। এরপর গত মে মাসে শক্তিশালী পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজেও একই ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে দল। ওই সিরিজে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে ২৫৩ রান সংগ্রহ করে সিরিজসেরা হয়েছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম, যার মধ্যে তার ক্যারিয়ারের রেকর্ড ১৪তম টেস্ট সেঞ্চুরির মাইলফলকও যুক্ত হয়েছিল।
শুধু টেস্ট ফরম্যাটেই নয়, সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও আশরাফুলের অধীনে কিছু সাফল্য এসেছে। গত মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে দারুণ এক ওয়ানডে সিরিজ জয় আসে। এরপর জুনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো পুরুষদের ওয়ানডে সিরিজ জয়ের গৌরব অর্জন করে বাংলাদেশ। তবে সব ফরম্যাটে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। গত আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র করলেও ডারউইনে দুর্দান্ত জয়ের পর ম্যাকাইতে মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হয়ে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বড় পরাজয়ের মুখে পড়েছিল দল। এছাড়া জুনে অস্ট্রেলিয়ার কাছে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছিল টাইগারদের।
সাম্প্রতিক সময়ে দলের ব্যাটারদের ধারাবাহিকতার অভাব এবং ব্যাটিং ধস বেশ জোরালোভাবেই আলোচনায় আসে। বিশেষ করে জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস এবং আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই মাঠের ব্যর্থতা এবং বড় মঞ্চে ব্যাটিং ইউনিটের ব্যর্থতা আশরাফুলকে কোচের পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। যদিও তার এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিগত সাফল্যও এসেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিসংখ্যান বলছে, এই ৩৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটাররা সব মিলিয়ে মোট ১১টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, যা দলের ব্যাটিং অর্ডারের উজ্জ্বল দিক বটে।
আশরাফুলের বিদায়ের পরপরই আসন্ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে দলের ব্যাটিং কোচের চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিচ্ছেন বিসিবির হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। আগামী ২৮ অক্টোবর থেকে মিরপুরের ঐতিহাসিক শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাওয়া দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে সালাউদ্দিনের কোচিংয়েই মাঠে নামবে দল। বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় দলের জন্য একজন স্থায়ী বিদেশি ব্যাটিং কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং বেশ কজন বিদেশি কোচের সঙ্গে বোর্ডের আলোচনা চলমান রয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পরপরই স্থায়ী কোচ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে বোর্ড।