বিচার বিভাগের শুদ্ধাচার ও পেশাগত মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হলে কেবল আর্থিক অনিয়মের দিকে নজর দিলেই চলবে না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিচারিক রায় বা সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতিত্ব কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা থাকলে তা বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই একটি শতভাগ নির্মোহ, নিরপেক্ষ ও জনকল্যাণমুখী বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিচারকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত একটি অভিজাত হোটেলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ শীর্ষক তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, একজন বিচারক হওয়ার মূল শর্তের মধ্যেই সততা ও নিরপেক্ষতার গভীর প্রত্যাশা নিহিত থাকে। বিচারকের জন্য সততা কোনো বাড়তি বা বিশেষ গুণ নয়, বরং এটি তার পেশাগত অস্তিত্বের মৌলিক ভিত্তি। বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের সুদৃঢ় আস্থা টিকিয়ে রাখতে বিচারকদের সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগের কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে সরকার ও মাননীয় প্রধান বিচারপতি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছেন। তবে একই সঙ্গে সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দিনরাত কাজ করে যাওয়া বিচারকদের স্বীকৃতি, উপযুক্ত বেতন-ভাতা, উন্নত আবাসন ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের জরুরি দায়িত্ব।
দেশের অতীত ইতিহাস ও বিচার বিভাগের ভূমিকা পর্যালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকা আবশ্যক। কিন্তু অতীতে গুম ও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলোতে বিচার বিভাগের প্রত্যাশিত ভূমিকা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। বিচার বিভাগকে এমন শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে, যাতে কোনো শাসক বা গোষ্ঠী ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে। বিশেষ করে অতীতে যেসব বিচারিক রায় ও সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত ও জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করেছে, সেগুলোকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বিচারকদের পেশাগত মর্যাদা ও দায়িত্ব স্মরণে এনে মন্ত্রী বলেন, বিপদগ্রস্ত মানুষ সৃষ্টিকর্তার পর ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারে হাজির হন। তাই অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে বিচারকদের পেশাগত স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করা উচিত নয়। বিচারকদের হাতে অর্পিত সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের আস্থা ও অধিকার রক্ষার জন্য এবং সেই ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিটি ধাপে নৈতিকতার পরিচয় দিতে হবে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের রুল অব ল, জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বিষয়ক সিনিয়র অ্যাডভাইজার রোমানা শোয়েগার এবং অনুষ্ঠানটিতে সঞ্চালনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।