ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,  ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করল সরকার নভেম্বর মাসে অপরিবর্তিত থাকছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম সহধর্মিণীকে নিয়ে টয়োটার প্রথম ঐতিহাসিক গাড়িতে উঠলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাউফলে জনস্বাস্থ্য দপ্তরের সামনেই ময়লার ভাগাড় রিজভী অসত্য তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন: গোলাম পরওয়ার ঠাকুরগাঁওয়ে ভোট জালিয়াতি ও হানাহানিহীন নির্বাচন হয়েছে: রিজভী ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ৬৬ কেন্দ্রে বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ধানের শীষ টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর ফিরতি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, যাত্রায় বিলম্ব ঐক্য সরকার নাকি আবার নির্বাচন? ইসরায়েলের সামনে এখন ৩টি পথ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ, চলছে গণনা

‘স্যার আমি গরীব মানুষ, টাকা কম নেন’


  • আপলোড সময় : সোমবার ১১ আগস্ট, ২০২৫ সময় : ৮:১২ পিএম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার:

কক্সবাজারের চকরিয়া থানার সেকেন্ড অফিসার ফজলে রাব্বি ইশানের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি থানার ভেতরেই নিজের কক্ষে বসে মামলার আসামি, জামিনপ্রার্থী কিংবা মামলার বাদী-পক্ষসহ বিভিন্ন জনের কাছ থেকে প্রকাশ্যে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন। শুধু তাই নয়, এসব অবৈধ লেনদেনের অর্থের একটি অংশ নাকি নিয়মিতভাবে ভাগ পান থানার অফিসার ইনচার্জও। প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে- সেকেন্ড অফিসার ফজলে রাব্বি ইশান টেবিলে বসে সরাসরি নগদ অর্থ গ্রহণ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমনভাবে ঘুষ লেনদেন চললেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যা এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র এবং থানার ভুক্তভোগী কয়েকজন অভিযোগ করেন, চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে কিংবা জামিনযোগ্য ধারা দেওয়ার শর্তে সেকেন্ড অফিসার ইশান নিয়মিতভাবে টাকা আদায় করে থাকেন। সরাসরি টাকা নিলেও, অনেক সময় একজন নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমে ঘুষ সংগ্রহ করেন তিনি।

প্রতিবেদকের হাতে থাকা ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে ঘুষ লেনদেনের পুরো ঘটনাটি। দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট মামলার আসামিপক্ষ থানায় প্রবেশ করে সরাসরি সেকেন্ড অফিসার ইশানের কক্ষে যায়। কক্ষে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ইশান আসামিপক্ষকে কঠোর ভঙ্গিতে হুমকি ও ভর্ৎসনা করতে থাকেন। তার রূঢ় ভাষা ও ভীতি প্রদর্শনে আতঙ্কিত হয়ে আসামিপক্ষ কয়েকবার অনুনয়-বিনয় করে। একপর্যায়ে, ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় আসামিপক্ষ জামার ভেতর থেকে হাজার টাকার নোটের একটি মোটা বান্ডেল বের করে ইশানের হাতে গুঁজে দেয়। ইশান টাকা গ্রহণ করার পর কোনো কথা না বলে বান্ডেলটি টেবিলের ড্রয়ারে গোপনে রেখে দেন। ভিডিওতে টাকা প্রদানকারী ব্যক্তিকে বলতে শুনা য়ায়, ‘স্যার আমি গরীব মানুষ টাকা কম নিন’। পুরো ঘটনাটি ভিডিওতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, যা ঘুষ বাণিজ্যের প্রমাণ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 স্থানীয়দের অভিযোগ, চকরিয়া থানায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম যোগদানের পর থেকেই থানার ভেতরে একটি প্রভাবশালী ঘুষবাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। জনশ্রুতি রয়েছে- এই সিন্ডিকেটের আর্থিক লেনদেনের দায়িত্বে আছেন সেকেন্ড অফিসার ফজলে রাব্বি ইশান, যিনি কার্যত থানার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করেন। অভিযোগ রয়েছে, থানার ভেতরে মামলার অগ্রগতি বা গতি পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপের জন্য নির্ধারিত একটি ‘রেট লিস্ট’ আছে। মামলার এজাহার বা চার্জশিটে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া, তদন্ত রিপোর্টে অনুকূল তথ্য সংযোজন, অভিযোগ খারিজ, এমনকি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার না করার শর্ত- সবকিছুই নির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিময়ে সম্পন্ন হয়। স্থানীয়দের দাবি, এসব অবৈধ লেনদেন প্রকাশ্যেই চলে এবং থানার একাংশ তা রীতিমতো আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।

 এর আগে চকরিয়া থানা দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও আলোচনার কেন্দ্রে আসে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায়। অভিযোগ ছিল, যৌন নির্যাতনের শিকার দুই নারী ন্যায়বিচারের আশায় থানায় গেলে, তাদের নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার বদলে থানার ভেতরেই আটক রাখা হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পরে পুলিশি হুমকিতে জোরপূর্বক তাদের দিয়ে মামলা আপসনামায় সই করিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা সেই সময়ে জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ইশান ডিএমপি থেকে বদলি হয়ে চকরিয়া থানায় যোগ দেন। এরপর এসআই সোহরাব সাকিব ও এএসআই পারভেজকে সাথে নিয়ে থানার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন। মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার ঘটে।

স্থানীয়দের দাবি, বর্তমান ওসি মো. শফিকুল ইসলাম যোগদানের পর ইশান সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্ব পান এবং তার পর থেকেই আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সাবেক ওসির আমলেও তিনি সাংবাদিক নির্যাতন থেকে শুরু করে মানুষের জমি দখল পর্যন্ত নানা অবৈধ কাজে জড়িত ছিলেন। অনেকেই তাকে চকরিয়া থানার অঘোষিত ওসি হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওসিও তার কথার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না। এমনকি চকরিয়া থানার কর্মকাণ্ডের প্রায় সবকিছুই ইশানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। থানায় কর্মরত এক সাব-ইন্সপেক্টরও স্বীকার করেছেন- ঈশানের পছন্দ না হলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতেও দ্বিধা করেন না তিনি।

স্থানীয় এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মামলায় নাম বাদ দিতে হলে বা চার্জশিটে ‘ক্লিনচিট’ নিতে হলে ফজলে রাব্বি ইশান নির্ধারিত হারে টাকা দিতে হয়। সেকেন্ড অফিসার ফজলে এলাহি নিজের ভাগ রেখে বাকিটা থানার ওসির কাছে পৌঁছে দেন বলে থানার ভেতরেই কথা প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, চকরিয়া থানায় টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না- এটা এখন সবার জানা কথা। মামলা করতে গেলে, অভিযোগ নিতে গেলে, এমনকি একটি সাধারণ জিডিও করাতে চাইলে আগে টাকা ধরিয়ে দিতে হয়। না দিলে হয়রানি আর দৌড়ঝাঁপের শেষ থাকে না।

এক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বলেন, আমরা ন্যায়বিচারের জন্য থানায় গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে হয়েছে টাকা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়। প্রতিটি পদক্ষেপে টাকা দাবি করে, যেন আইন-শৃঙ্খলা নয়, টাকার ক্ষমতাই সেখানে বড় কথা। টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সেকেন্ড অফিসার ফজলে রাব্বি ইশান দাবি করেন, কারো কাছে টাকা নেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা টাকা লেনদেনের ভিডিও ফুটেজের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে চকরিয়া থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলামকে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, থানায় এমন কোনো ঘটনা তার জানা নেই। তিনি বলেন, ভিডিওটি পাঠালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কক্সবাজার জেলা জজকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, পুলিশ বিভাগে এমন আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় সুশীল সমাজ। তার দাবি, যারা অপরাধ দমন করবে, তারাই যদি ঘুষের বিনিময়ে অপরাধীদের আড়াল করে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা দুরূহ হয়ে পড়ে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র জসিম উদ্দিন জানান, এ বিষয়ে এখনও কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ এলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আকাশজমিন/আরআর


এ সম্পর্কিত আরো খবর