ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬,  ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দরপত্র ছাড়াই বন্দর চুক্তি: জাতীয় স্বার্থ কোথায়?


  • আপলোড সময় : বুধবার ১৯ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৪:১২ পিএম

বন্দর পরিচালনা ও উন্নয়ন নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলোতে নানা অসঙ্গতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। সরকারের দাবি—বিদেশি বিনিয়োগ আসলে বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এই যুক্তিগুলো বাস্তবে কতটা সঙ্গত—তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের তীব্র প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষত দুটি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে আকস্মিক চুক্তি স্বাক্ষর, শর্ত প্রকাশে অনীহা, দরপত্র ছাড়া সিদ্ধান্ত—এসব ঘটনাই সংশয় বাড়িয়েছে।

সরকারের যুক্তি হলো—বাহিরের বড় কোম্পানি আসলে উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে বন্দর পরিচালনায় নতুন গতি আসবে। আর বিদেশি কোম্পানিগুলো অধিকতর স্বচ্ছ বিধায় স্থানীয় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই যুক্তিগুলোর সঙ্গে বাস্তবতা মিলছে না; বরং প্রক্রিয়ার অভাব, জরুরি তথ্য লুকানো এবং জনগণের অজানায় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাতেই এর বড় প্রমাণ দেখা যায়। দেশের ইতিহাসে একটি অস্বাভাবিক দিনে সরকার ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্দরসম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। একদিনেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া—এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। তার ওপর চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করা এবং পুরো প্রক্রিয়া গোপন রাখার সিদ্ধান্ত—লুকোচুরির অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেছেন, চুক্তির নথি জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য নয়। অথচ এটি জনগণের সম্পদ ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিদেশি বিনিয়োগ একটি দেশের জন্য প্রয়োজনীয়—এটা সত্য। কিন্তু যে বিনিয়োগ আসছে, তার শর্ত কী, বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য কী এবং বিনিয়োগের ফলে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও সমাজ কতটা লাভবান হবে—এগুলোর ওপর নির্ভর করে সেই বিনিয়োগ লাভজনক নাকি ক্ষতিকর হবে। এমনকি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, অতীত কর্মধারা, পরিবেশগত মানদণ্ড মানার ক্ষমতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।

বাংলাদেশে বড় বড় বিদেশি বিনিয়োগের ইতিহাস খুব সুখকর নয়। সুন্দরবন ঘেঁষে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, বাঁশখালী, পায়রা ও রূপপুর—এসব প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগের নামে প্রকৃতি, নদী এবং পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক প্রকল্পে দেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি; বরং বিপরীতে অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবেশগত ক্ষতি এবং আর্থিক চাপ বেড়েছে। এসব উদাহরণ দেখিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—বিদেশি বিনিয়োগ মানেই সুফল, এমন ভাবা ভুল।

আবার সাম্প্রতিক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাবেও দরপত্র আহ্বানের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ও বিডার চেয়ারম্যান বলেছেন—বিদেশি কোম্পানি আনলে দক্ষতা বাড়বে এবং দুর্নীতি কমবে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দরপত্র ছাড়া সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া—স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। আবুধাবির যে কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তার সক্ষমতা নিয়ে সরকারের বিশ্লেষণ রয়েছে—কিন্তু জনগণের সামনে সেই যুক্তি-প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মাশুল ৪০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া। সরকারের যুক্তি, উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণের জন্য এটি দরকার। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের দাবি—এটি আসলে বিদেশি কোম্পানির উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার কৌশল। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। নিয়মিতভাবে এর আয় ব্যয়ের চেয়ে দ্বিগুণ। তাহলে উন্নয়নের জন্য বাড়তি অর্থের দরকার কোথায়? তার ওপর দেশের কাস্টমস ও প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে শুধু টার্মিনাল অপারেটর পরিবর্তন করলে সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে—এ ধারণাকে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকে।

এখন প্রশ্ন—এই তাড়াহুড়ো কেন? কেন গোপনীয়তা? কেন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে এ ধরনের চুক্তি? একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল—গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য পরিবেশ তৈরি করা, নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা তৈরির একটি ভিত্তি তৈরি করা। বন্দর পরিচালনা বা ৩০ থেকে ৪০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদের চুক্তি—এসব সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের করার কথা। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বার্থ ও সক্ষমতার প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ফেলছে।

জুলাই সনদ ও বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী—দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা, কাঠামোগত সংস্কারের পথরেখা প্রস্তুত করা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বাড়ানোর মতো কাজ ছিল তাদের অগ্রাধিকার। কিন্তু কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে, কারা দায়ী—এসব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করেই পুরো জাতিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে এবং দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দুর্নীতিবাজরা কেবল বন্দরে নয়—সচিবালয়সহ বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর তুলে দেওয়াকে অনেকে ‘হীনম্মন্যতার নিদর্শন’ বলছেন।

এ চুক্তিগুলোকে অনেকে বিদেশি লবিস্ট ও কমিশনভোগীদের সাফল্য হিসেবেও দেখছেন। কারণ জনস্বার্থ উপেক্ষা করে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার মতো প্রক্রিয়া এতে দেখা যাচ্ছে। দেশীয় সক্ষমতাকে অস্বীকার করে বলা হচ্ছে—বাংলাদেশ নিজের বন্দর পরিচালনা করতে পারে না। অথচ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর যদি একটি বন্দরও নিজস্বভাবে চালাতে না পারে—তাহলে এ স্বাধীনতার অর্জন কী? দেশের প্রায় দেড়শ বিশ্ববিদ্যালয়, হাজারো বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠান—এরা কি তাহলে শুধু নামেই আছে?

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি হলো—নিজস্ব সক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো। জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন বা স্বচ্ছ শাসন কখনোই সম্ভব নয়। আর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির নেতিবাচক প্রভাব—অর্থনীতি, পরিবেশ ও সার্বভৌমত্বে আগামী বহু বছর ধরে অনুভূত হবে। যখন সমস্যা তৈরি হবে, তখন এ সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী কাউকেই আর পাওয়া যাবে না।

আনু মুহাম্মদ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ



এ সম্পর্কিত আরো খবর