ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৯০ দিন বাড়ল ডাকসুর সময়সীমা, তফসিল ঘোষণাতেই বাতিল হবে কমিটি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১৬ ডেঙ্গুতে একদিনে আরও ৮ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৫৯৩ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই চীন সফরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি কিম জং উনের ছেলে সন্তান ঘিরে রহস্য, উত্তরসূরি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তর্ক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ডিএসসিসি কার্যালয়ে প্রশাসকের ঝটিকা পরিদর্শন জ্বালানি হামলা বন্ধের প্রস্তাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কী বলল মস্কো? পবিত্র মক্কা, জেদ্দা ও তাইফে জরুরি সতর্কতা জারি করল সৌদি আরব ৭ জনের ফাঁসির রায়ে ককটেল বিস্ফোরণ বড় বিষয় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

৫৫তম বিজয় দিবস আজ, রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সারাদেশ


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ সময় : ৯:৩৫ এএম

আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর একটি। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ। দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র—বাংলাদেশ। লাল-সবুজের পতাকা উড্ডীন হয় স্বাধীন ভূখণ্ডে। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ ও অসংখ্য মা-বোনের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই বিজয় বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত স্বীকৃতি।

৫৫তম মহান বিজয় দিবস এবার এসেছে এক ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। এই সরকারের আমলেই আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এমন বাস্তবতায় এবারের বিজয় দিবস কেবল স্মরণ ও শ্রদ্ধার দিন নয়, বরং নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের অঙ্গীকারের দিন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী দিয়েছেন। তারা দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী অগণিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের, যাদের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছিল। একই সঙ্গে স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে দেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। দিবসের সূচনা হবে প্রত্যুষে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হবে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক, সড়কদ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো জাতীয় পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন নিশান দিয়ে সাজানো হয়েছে।

সূর্যোদয়ের পর সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজমের নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ পর্যায়ক্রমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে এসে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

বিজয় দিবস উপলক্ষে বেলা ১১টা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ফ্লাই পাস্ট মহড়া পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে বিজয় দিবসের বিশেষ ব্যান্ডশো। এই আয়োজনের অংশ হিসেবে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং করবেন। এটি বিশ্বের সর্বাধিক পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং প্রদর্শনী হিসেবে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও বিএনসিসির বাদক দল বাদ্য পরিবেশন করবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় তিন দিনব্যাপী আড়ম্বরপূর্ণ বিজয়মেলা অনুষ্ঠিত হবে। সকাল ৯টায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শনের আয়োজন করা হবে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বিজয়ের চেতনা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আজ বিকেল ৩টা থেকে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় দিবসের গান পরিবেশন করা হবে। একই সঙ্গে সারাদেশের ৬৪ জেলায় একযোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করবেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। এর আগে গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অ্যাক্রোবেটিক শো এবং সন্ধ্যায় যাত্রাপালা ‘জেনারেল ওসমানী’ মঞ্চস্থ হয়েছে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতেও দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে অনুরূপ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

বিকেলে বঙ্গভবনে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেবেন রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। একই সঙ্গে মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বিজয় দিবস উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল ম্যাচ, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, কাবাডি ও হাডুডু প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।

দেশের সব হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র এবং শিশু পরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত, যুদ্ধাহত ও মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য এবং দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে সারাদেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ও বেতার চ্যানেলে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসভিত্তিক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রগুলো দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ঢাকাসহ সারাদেশের সিনেমা হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা ও পায়রা বন্দর, ঢাকার সদরঘাট, পাগলা ও বরিশালসহ বিআইডব্লিউটিসির বিভিন্ন ঘাটে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের একক ও যৌথ উদ্যোগে জাহাজগুলো সকাল ৯টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জনসাধারণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দিনব্যাপী আলোচনা সভা, শ্রদ্ধা নিবেদন, র‌্যালি ও অন্যান্য কর্মসূচির আয়োজন করেছে। পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, গণতন্ত্র মঞ্চ, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, এলডিপি, সিপিবি, বাসদ, গণফোরাম, বাংলাদেশ জাসদ, জেএসডি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্কসবাদী) ও জাকের পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও নিজ নিজ কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করছে।

মহান বিজয় দিবস কেবল অতীতের স্মরণ নয়, এটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। এই দিনে জাতি নতুন করে অঙ্গীকার করে—মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর