দেশজুড়ে তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশের চারটি বিভাগ ও ১২ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, পৌষের শেষের দিকে জেঁকে বসা শীতে বুধবার নওগাঁর বদলগাছিতে মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। শৈত্যপ্রবাহ কয়েকদিন এমনই থাকতে পারে এবং সারা দেশে কুয়াশার দাপটও বজায় থাকবে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলা এবং রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তীব্র শীত অনুভূতি আরও দুইদিন থাকতে পারে, পরে তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে শীতের অনুভূতি কমতে পারে। পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে রোদের ঝলক দেখা গেলেও পশ্চিমাঞ্চলে কুয়াশা ছিল। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার কুয়াশার পরিস্থিতি থাকবে, এরপর কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে পুরো জানুয়ারি মাসে শীত অনুভূত থাকবে।
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের বেশির ভাগই খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন। যশোর শহরের বিভিন্ন শ্রমবাজারে আগে যেখানে ৩০০-৪০০ মানুষ কাজের আশায় জড়ো হতেন, শীতের কারণে কাজ কম হওয়ায় সংখ্যাটা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
রিকশাচালক ও নির্মাণশ্রমিকরা জানান, শীতের কারণে লোকজন বাইরে কম বের হচ্ছে। নির্মাণ ও অন্যান্য কাজ তেমন করা হচ্ছে না, ফলে আয় কমে গেছে। কিন্তু সংসারের ব্যয় তো কমছে না। একই চিত্র দেশের অন্যান্য জেলাতেও দেখা যাচ্ছে।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে গত ২০ দিনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ৯ ও বয়স্ক নারী-পুরুষ ৭ জন। চিকিৎসকরা বলছেন, শীত মৌসুমে তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। হাসপাতালের নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু ও বৃদ্ধ।
হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্র জানায়, তিনটি ওয়ার্ডে ১২০ শয্যার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ২৫৭ জন। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি আছেন ৩৪ জন। মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে রোগী ঠাসা, অনেকের চিকিৎসা হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়।
রংপুরের হারাগাছ পৌরসভার কেয়া মনির (২০) দুই মাস বয়সী মেয়ে মুনতাহাও নিউমোনিয়া আক্রান্ত। মা নুরী বেগম বলেন, ‘সূর্য দেখা যায় না। রাতেও ঝুড়ির মতো টিনের চাল দিয়ে শীত পড়ে। আমরা গরিব। ল্যাপ, তোশক নেই। বাচ্চার জন্য চিন্তায় আছি।’
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘শীতে সব সময় ঠান্ডাজনিত রোগ বাড়ে। শীতকালে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, বিশেষ করে ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া ও অ্যাজমার রোগী বেশি আসে। এ ছাড়া রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়াও দেখা দেয়।’ মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান জানান, ছয়টি ইউনিটে ১৩৫ শয্যা থাকলেও গড়ে ৬০০-৭০০ রোগী ভর্তি হন। শীতজনিত রোগের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও স্ট্রোকজনিত রোগ বেশি হচ্ছে। মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিক।
যশোরে শৈত্যপ্রবাহ বেড়েছে। তিন দিন পর বুধবার সূর্য দেখা মিলেছে। রোদের উত্তাপে হাড়ের কাঁপন কমলেও দুর্ভোগ কমেনি। বুধবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যশোর বিমানবাহিনীর আবহাওয়া অফিস জানায়, মঙ্গলবার ভোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.২ ডিগ্রি, সোমবার ১০ ডিগ্রি। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৫.৮ থেকে ১৬.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। গত ১২ দিন ধরে এই জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে।
আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ৮.১-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ, ৬.১-৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ, ৪.১-৬ ডিগ্রি হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
যশোর শহরের রিকশাচালক রবিউল হোসেন বলেন, ‘গত তিন দিনে সারাদিন কুয়াশা ও বাতাস ছিল। রোদ উঠায় দিনের বেলায় কাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু সকাল ও সন্ধ্যায় হাত-পা অবশ হয়ে যায়।’ ধর্মতলার রিকশাচালক আলী হোসেনও একই কথা বলেন, ‘সন্ধ্যায় বের হয়ে আয় করার পর রাতের আগে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। শীতের কারণে মানুষ কম বের হচ্ছে। ভাড়াও কম।’
সাতক্ষীরায় তাপমাত্রা নেমেছে ৮ ডিগ্রি। হাড় কাঁপানো শীতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে গেছে। খেটে খাওয়া মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে। জেলা প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠন শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু করেছে, তবে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
হিলিতে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরো বীজ গাজছে না বা হলদে হয়ে পচে যাচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, বীজতলা রক্ষায় ছত্রাকনাশক স্প্রে, স্বচ্ছ পলিথিন ঢেকে রাখা ও সূর্য আলোর দেখা না পাওয়ার সময় রশিটানা ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নীলফামারীতে শীতজনিত রোগে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। ডিমলা আবহাওয়া অফিসের সহকারী কর্মকর্তা এমডি আব্দুস সবুর মিয়া জানান, এমন শীত আরও কয়েকদিন থাকতে পারে। নীলফামারীর খগাখড়িবাড়ী গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘শিশুদের বমি, সর্দি, কাশি রয়েছে। সরকারিভাবে দু’একখান কম্বল পাওয়া যাচ্ছে।’ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আব্দুল আউয়াল জানান, শিশু ও নবজাতকরা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শীতের প্রকোপ এবং ঠান্ডাজনিত রোগ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ও শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জরুরি। শীতার্তরা মোজা, গরম কাপড় ব্যবহার, গরম খাবার ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।