ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তি কতটুকু, ঘাঁটি থেকে কি ইরানে হামলা সম্ভব


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৮:২৮ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সম্প্রতি মোতায়েন করা নৌবহর ছাড়াও অন্তত ১৯টি স্থানে মার্কিন সামরিক, নৌ ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ হাজার সেনা অবস্থান করছেন। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানিয়েছে, এসব স্থাপনার মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। এই ঘাঁটিগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তুরস্ক ও জিবুতিতে বড় ধরনের সামরিক ঘাঁটি রক্ষণাবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যা মধ্যপ্রাচ্যের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব স্থাপনা থেকে সরাসরি অভিযানের সমন্বয়, নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বাহরাইনে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন এবং এটি মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর। এই ফ্লিটের দায়িত্বের আওতায় রয়েছে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের অংশবিশেষ। কাতারের দোহায় মরু অঞ্চলে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এর কৌশলগত সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত। সেন্টকমের অধীনে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশও অন্তর্ভুক্ত।

আল-উদেইদ এই অঞ্চলের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা অবস্থান করছেন। ঘাঁটিটিতে যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার, গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থা এবং উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি রয়েছে। কুয়েতে অবস্থিত ক্যাম্প আরিফজান মার্কিন স্থলবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর হিসেবে কাজ করছে। এসব ঘাঁটি আঞ্চলিক সামরিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনের কারণে মার্কিন ঘাঁটি, সেনা সংখ্যা ও সামরিক সরঞ্জামের অবস্থানগত পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আল-উদেইদ ও বাহরাইন নৌঘাঁটিতে কেন্দ্রীভূত। নৌশক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজও সম্প্রতি পুনরায় মোতায়েন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন নামের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। এটি বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। ওমান উপকূলের কাছে অবস্থানরত এই রণতরী ইরানের ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে। এর সঙ্গে থাকা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে আর্লে বার্ক শ্রেণির ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী জাহাজ রয়েছে, যেগুলো টমাহক ক্রুজ মিসাইল দ্বারা সজ্জিত। এই মিসাইল ইরানের অভ্যন্তরে গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই ঘাঁটিগুলো থেকে সরাসরি ইরানে হামলা চালানো সম্ভব কি না। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ‘শত্রুতামূলক সামরিক পদক্ষেপে’ তাদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলপথ ব্যবহার করতে দেবে না। একই অবস্থান স্পষ্ট করেছে সৌদি আরবও। ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিশ্চিত করেছেন যে তাদের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না।

তবে ওয়াশিংটন বিভিন্ন আঞ্চলিক মিত্রকে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনে রাজি করানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের জন্য আঞ্চলিক সমর্থন জোরদার করতে চায়।

অন্যদিকে কাতার, ওমান ও তুরস্ক সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। সম্প্রতি তুরস্কে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগে একটি দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আদানা প্রদেশে অবস্থিত ইনসিরলিক মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে গুপ্তচরবৃত্তির চেষ্টা করার অভিযোগ রয়েছে।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর আল-উদেইদ ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে প্রতিশোধ নিয়েছিল ইরান। বর্তমান উত্তেজনার মধ্যেও সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘাঁটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার না করলে সরাসরি ইরানে বড় ধরনের হামলা পরিচালনা জটিল হয়ে পড়ে। বিমানবাহী রণতরী ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা থাকলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা সামরিক সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য, মিত্র দেশের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাত বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোও চাপে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কৌশলগত হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর