ক্রীড়া ডেস্ক
নারী এশিয়া কাপের নতুন আসরেও শ্রীলঙ্কাকে একপেশে ম্যাচে ৭২ রানে হারিয়ে রেকর্ড অষ্টমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ভারত। তবে মাঠের দুর্দান্ত জয়ের চেয়েও পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ ও তার চারপাশের ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক বিতর্ক। ক্রিকেট মহাদেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) সভাপতি এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) প্রধান মহসিন নাকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অনড় অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিজয়ী ভারতীয় নারী দল।
গত বছর পুরুষ এশিয়া কাপে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দল যেভাবে নাকভির হাত থেকে ট্রফি ও মেডেল না নিয়ে মাঠ ত্যাগ করেছিল, এবার নারী দলও ঠিক একই নীতি অনুসরণ করল। ট্রফি হাতে নেওয়া ছাড়াই চ্যাম্পিয়ন উদযাপন সম্পন্ন করে হারমানপ্রীত কৌরের দল। তবে পুরস্কার বিতরণীর এই বিতর্কিত পর্ব শেষে মাঠ ছাড়ার সময় গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শক-সমর্থকদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে এসিসি প্রধান মহসিন নাকভিকে। স্টেডিয়ামের গ্যালারির একাংশ থেকে দর্শকেরা তাকে ‘ট্রফি চোর’ বলে ভূষিত করে চিৎকার করতে থাকে। এই চরম অপবাদ ও কটূক্তির মাঝেও অবশ্য বাহ্যিকভাবে শান্ত মেজাজ বজায় রেখে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন পিসিবি প্রধান।
ঘটনার জল গড়ানোর পর ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতীয় নারী দলের প্রধান কোচ অমল মজুমদার। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন যে ভারত এখন আনুষ্ঠানিকভাবে নারী এশিয়া কাপের চ্যাম্পিয়ন এবং ট্রফি তারা আনুষ্ঠানিকভাবে হাতে নিয়েছে কি নেয়নি, সেটা তাদের কাছে কোনো বড় বিষয় নয়। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, এসিসি সভাপতির হাত থেকে ট্রফি না নেওয়ার এই কঠোর সিদ্ধান্তটি মূলত ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (বিসিসিআই)। বোর্ডের এই নীতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খেলোয়াড়রা পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে নামেননি এবং এটি নিয়ে দলের আলাদা কোনো মতামত দেওয়ার অবকাশ নেই।
এর আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এবং তার জবাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিচালনা করা 'অপারেশন সিঁদুর'-এর পর থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে চরম অবনতি দেখা দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উভয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও। পরবর্তীতে এশিয়ান কাপ কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) যেকোনো বৈশ্বিক ইভেন্টে মুখোমুখি হলেও ভারত ও পাকিস্তানের খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের মধ্যে সৌজন্যমূলক করমর্দন বা হাত মেলানো পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সেই রাজনৈতিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতাতেই গত বছর ভারতের পুরুষ দল নাকভির কাছ থেকে ট্রফি ও মেডেল নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেই ট্রফিটি এখনো ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি, বরং এসিসির সদর দপ্তরেই রক্ষিত আছে। এবারও একই ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেল ভারতীয় নারী দলের বিজয়ের পর।
এবার ভারতীয় দলের কোনো সদস্য মঞ্চে না ওঠায় পুরস্কার বিতরণের পুরো প্রক্রিয়াটিতেই ঘটে ব্যতিক্রমী ঘটনা। বিসিসিআই সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া সরাসরি ভারতীয় ড্রেসিংরুমে গিয়ে তরুণ খেলোয়াড় নন্দিনী শর্মার হাতে সেরা ফিল্ডারের পদক তুলে দেন। অন্যদিকে ম্যাচ শেষ হওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর রানার্সআপ হওয়া শ্রীলঙ্কা দলের খেলোয়াড়দের হাতে মেডেল ও রানার্সআপ ট্রফির চেক তুলে দেন এসিসি সভাপতি মহসিন নাকভি। শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক চামারি আতাপাত্তুকে পুরস্কার প্রদান সম্পন্ন করেই তড়িঘড়ি করে স্টেডিয়াম ত্যাগ করেন তিনি। তবে গতবার চ্যাম্পিয়ন দলের অনুপস্থিতিতে ট্রফি সাথে করে নিয়ে গেলেও, এবার আর ট্রফি সাথে না নিয়েই মাঠ ছাড়তে দেখা যায় তাকে।
খেলার মাঠের এমন অভূতপূর্ব ঘটনা এবং সমর্থকদের পক্ষ থেকে এসিসি প্রধানকে সরাসরি ‘ট্রফি চোর’ আখ্যা দেওয়ার দৃশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও সামাজিক মাধ্যমে জোর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। টুর্নামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও খেলার সঙ্গে রাজনীতির টানাপোড়েন কতটা গভীর হতে পারে, তা এশিয়া কাপের এই ট্রফি বিতরণী মঞ্চে আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো।