আন্তর্জাতিক ডেস্ক
স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে বিশ্ব সম্ভবত এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দুটি প্রধান যুদ্ধ বিশ্বশান্তিকে গ্রাস করে চলেছে—একটি ইউরোপের সমগ্র নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে এবং অন্যটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে। একইসঙ্গে পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমাগত সামরিক প্রস্তুতি এবং রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তায় উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও সামরিক প্রযুক্তির আধুনিকায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্বজুড়ে আগ্রাসী শক্তিগুলোর এই উত্থান নতুন করে এক বৈশ্বিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব হলে সেটি মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ সমাপ্তিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও ইউক্রেন ও ইরান কেন্দ্রিক যুদ্ধ দুটি পৃথক ভৌগোলিক এলাকায় চলমান, তবুও সম্প্রতি এগুলোর মধ্যে স্পষ্ট কৌশলগত যোগসূত্র লক্ষ্য করা গেছে। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই সম্পর্কের রসায়ন স্পষ্ট হয়। এমনকি ইউক্রেনের ড্রোন বিশেষজ্ঞরা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গিয়ে সামরিক কৌশল বিনিময় করছেন এবং কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া ও ইরানের অস্ত্র বহনকারী চালান ধ্বংসের ঘটনা সংঘাত দুটিকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে।
সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে দুই দেশই এখন অর্থনৈতিক ও মানবেতরভাবে চরম ক্লান্ত। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ৫ লাখ সেনা নিহত হয়েছে এবং মোট হতাহতের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের কাছাকাছি। ইউক্রেনীয় ড্রোনের ধারাবাহিক আঘাতে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির অর্থনীতিতে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। অপরদিকে ইউক্রেনের প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৬ লাখ ২৫ হাজার সেনা হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, যার মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে দেড় লাখের মতো। দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, চিকিৎসালয় ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে লাখ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের বহুমাত্রিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকার সামরিক ব্যয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত অন্তত ১৭টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্রগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এছাড়া স্ট্র্যাটেজিক হরমুজ প্রণালি ও তেলবাহী জাহাজে আক্রমণের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে সব পক্ষই নিজেদের শর্তে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে দ্রুত সরকার পরিবর্তনের আশা করলেও বাস্তবে তা ঘটেনি, বরং মার্কিন হামলায় বেসামরিক প্রাণহানি বিশ্বমঞ্চে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে কৌশলগত চাল চালছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তার প্রস্তাবিত ফর্মুলা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে রাজনৈতিক সমঝোতায় এনে ইউরোপের যুদ্ধ থামাতে পারে, তবে রাশিয়াও তেহরানকে চাপ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামাতে প্রস্তুত। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধিদলের মস্কো ও কিয়েভ সফর এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের আহ্বান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি ঘটলেই হয়তো বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি।