ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ

আইসোলেশন ও সতর্কতার নির্দেশ বিশেষজ্ঞদের

সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১০:২১ এএম

সারাদেশজুড়ে এখন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের ভাইরাসজনিত জ্বর। একই সময়ে ডেঙ্গু, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফয়েড, চিকুনগুনিয়া এবং মামসের মতো সংক্রামক ব্যাধির মারাত্মক প্রকোপ দেখা দেওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। সাধারণ ফ্লু মনে করে শুরু হলেও অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ এবং অতিরিক্ত জনসমাগমের স্থানগুলো থেকে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই সব ভাইরাস দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, ফলে প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একজন না একজন জ্বরে ভুগছেন।

 

বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে রাজধানীজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে এই স্বাস্থ্য পরিস্থিতি। প্রতিদিন উত্তরা থেকে মেট্রোরেলে যাতায়াতকারী তামনিয়া ইসলাম জানান, গত বৃহস্পতিবার মেয়েকে নিয়ে মেট্রোরেলে ওঠার পর রাতে মা-মেয়ে দুজনেরই জ্বর আসে। তার জ্বর দুই দিন পর কিছুটা কমলেও, ১০ বছর বয়সী বড় মেয়ে ও চার বছর বয়সী ছোট মেয়ে টানা উচ্চ জ্বরে ভুগছে। ডেঙ্গু নাকি হামে আক্রান্ত হলো—এই আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। তামনিয়া ইসলামের মতো রাজধানীর হাজার হাজার পরিবার এখন একই ধরনের অনিশ্চয়তা ও ভয়ে দিনাতিপাত করছে।

 

রাজধানীর প্রধান শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া রোগীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে ঘুরে দেখা যায়, ছোট শিশুদের কোলে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন উৎকণ্ঠিত বাবা-মায়েরা। কারও বাচ্চার নাক দিয়ে পানি পড়ছে, কারও নিস্তেজ ভাব, আবার কারও চরম শ্বাসকষ্ট বা তীব্র কাশি। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক সময়ে বহির্বিভাগে প্রতিদিন যেখানে ২০০ থেকে ২৫০ জন শিশু চিকিৎসা নিত, এখন সেই সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে জরুরি ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক রোগী আসছে। এদের মধ্যে প্রায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ শিশুকে জটিলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত মার্চ-এপ্রিল এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে ইনফ্লুয়েনজা টাইপ-এ, টাইফয়েড, প্যারা-টাইফয়েড এবং হামের প্রাদুর্ভাব সর্বাধিক। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ জানান, সব জ্বরের মধ্যে বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রকোপ শীর্ষে রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগী ঘরে বসেই চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত কো-মরবিডিটি থাকা রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করানো জরুরি। এছাড়া অতিরিক্ত বমি বা রক্তক্ষরণ হলে কোনোভাবেই ঘরে রাখা যাবে না।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, বর্তমানে হাম ও ডেঙ্গু জ্বরে শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে টাইফয়েড এবং মামস। শিশুদের চোখে পিঁচুটি জমা, গলার টনসিল ফোলা বা জয়েন্টে তীব্র ব্যথাসহ চিকনগুনিয়ার উপসর্গও দেখা যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বরের সঙ্গে শরীরে র‌্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে শিশুকে অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত। আক্রান্ত শিশুকে অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে, পর্যাপ্ত তরল খাবার খাওয়াতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথার ওষুধ খাওয়ানো একদম নিষেধ।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জনে, যার মধ্যে কেবল চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম ১৩ দিনেই ৫২ জন মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৫১৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ হাজার ৮৩৭ জনে পৌঁছেছে। মৃত ব্যক্তিদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃতদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ নারী এবং ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ।

 

একই সাথে দেশে হাম ও এর উপসর্গে শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গে মোট ৯২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাব নিশ্চিত হামে ১০০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে মোট ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জন শিশু হামের উপসর্গে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। ভয়াবহ এই ভাইরাস পরিস্থিতি সামাল দিতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


এ সম্পর্কিত আরো খবর