আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকা মহানগরী এবং এর পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, ভূমি উন্নয়ন, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লট বরাদ্দ এবং ইমারত নির্মাণ নকশা অনুমোদনের প্রধান রাষ্ট্রীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক। পরিকল্পিত ও আধুনিক নগর গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও একাধিক অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত ও সরেজমিন অনুসন্ধানে রাজউকের নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের চিত্র সামনে এসেছে, যা জনমনে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির অসাধু চক্রের ক্ষমতার দাপট ও অবৈধ সম্পদের প্রভাবে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগের তালিকায় রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। রাজউকের দায়িত্বশীল নির্বাহী প্রকৌশলী পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি নিজ নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে জানা যায়।
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, রফিকুল ইসলামের নামে রাজধানীর অভিজাত উত্তরা এলাকায় একটি বহুতল ৬ তলা আবাসিক ভবন, রাজউকের আওতাধীন একাধিক মূল্যবান প্লট এবং রাজউকের মেগা প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহরে মূল্যবান প্লটসহ আনুমানিক শত কোটি টাকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের মালিকানা রয়েছে। শুধু উচ্চপদস্থ প্রকৌশলীই নন, রাজউকের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যেও রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নজির দেখা গেছে। রাজউকের সিকিউরিটি গার্ড পদে কর্মরত আব্দুল মালেক নামের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আয়ের সুনির্দিষ্ট উৎসের সাথে চরম অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অস্বাভাবিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আয়ের তুলনায় এমন অকল্পনীয় সম্পদের মালিকানা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোর একটি হলো আইন বিভাগ। কিন্তু ভুক্তভোগীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, আইন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলা ও অনিয়মের কারণে আইনি প্রতিকার চাওয়া নাগরিকরা চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ "পরিচালক (আইন)" এবং "আইন কর্মকর্তা" পদধারীরা আদালতের নির্দেশনা ও নথি বছরের পর বছর আটকে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো রিট পিটিশনের বিষয়ে বিগত তিন বছর ধরে কোনো কার্যকর বা ইতিবাচক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি হাইকোর্টে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাবও দাখিল করা হয়নি, যার ফলে ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ বছরের পর বছর আদালতের দোরগোড়ায় ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত বিচার ও সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একইভাবে রাজউকের প্রশাসন বিভাগের ভূমিকা নিয়েও গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। রাজউকের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়ে "পরিচালক (প্রশাসন)" পদে কর্মরত উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা বরাবর বারবার অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো শক্ত ও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেননি। প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ভুক্তভোগীদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে প্রশাসনিক সুরক্ষার সুযোগ নিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
ভুক্তভোগীর সচিত্র ও বিস্তারিত বক্তব্য পর্যালোচনা করলে রাজউকের ভেতরের চরম অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত স্থবিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। ভুক্তভোগী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, ২০২৩ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বরাবরে একটি যৌক্তিক আবেদন এবং পরবর্তীতে লিখিত দরখাস্ত দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক কোনো সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে বিষয়টি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। বিগত তিন বছর যাবত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইন বিভাগের পরিচালক এবং আইন কর্মকর্তারা ওই হাইকোর্টের রিটের বিষয়ে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি জবাব দাখিল না করে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি ইস্যু করেই আইন বিভাগ তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই চিঠির কোনো বাস্তব বাস্তবায়ন ঘটানো হয়নি। ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আসলে কে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? রাজউকের সবাই কমবেশি দুর্নীতির সাথে জড়িত। এই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দেখার মতো কেউ নেই, কারণ যারা তদারকি করবে বা ব্যবস্থা নেবে, তারা নিজেরাও কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধীদের রক্ষক। অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজউকের পরিচালক (আইন) এবং সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বিত্তশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয় না। প্রশাসন ক্যাডারের উপসচিব পদমর্যাদার পরিচালক (প্রশাসন)-এর কাছে বারবার ধর্না দিয়েও কেবল আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলেনি।
রাজউকের প্রশাসনিক ও বিচারিক স্থবিরতার পাশাপাশি সার্বিক সেবা প্রদান ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় গভীর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ বহু পুরোনো। রাজউকের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট হস্তান্তরে স্বচ্ছতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে, সাধারণ গৃহপ্রতিনিধি বা নাগরিকরা যখন ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য রাজউকে আবেদন করেন, তখন ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হয়। নকশা পাস করানোর প্রতিটি ধাপে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষ প্রদান না করলে ফাইল আটকে রাখা রাজউকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই সার্বিক দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্থবিরতা থেকে বের হতে হলে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন আবশ্যক। প্রথমত, অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মালেকসহ রাজউকের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিস্তারিত সম্পদের হিসাব দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আইন বিভাগের স্বচ্ছতা ফেরাতে সকল রিট পিটিশন ও চলমান মামলার বর্তমান অগ্রগতি নিয়মিত রাজউকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে হালনাগাদ ও প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রশাসনিক তদারকির জন্য রাজউকের বাইরে থেকে একটি স্বাধীন মনিটরিং সেল গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। রাজউকের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সংস্থায় জনআস্থা ফিরিয়ে আনা আবশ্যক। দ্রষ্টব্য হিসেবে উল্লেখ্য যে, এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত সকল অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ মাত্র; আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আইন বিভাগ হতে গত ২৪/০৮/২০২৬ খ্রি. তারিখে স্মারক নং- ২৫.৩৯.০০০০.০১৩.০৪.৩১৮ (অংশ) ২৩- ১৯৯০ স্থা মূলে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি ইস্যু করা হয়
আকাশজমিন / আরআর