সাবেক উপদেষ্টা এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বের একাধিক দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ লাভ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংক গোপনীয়তার জন্য পরিচিত সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ও নগদ অর্থ জমা রাখা এবং বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ সরাসরি বিনিয়োগ করে নামে-বেনামে স্থাবর-অস্থাবর বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নামার বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে দেশের সর্বোচ্চ এই স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ।
কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সার্বিক তদন্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বলেন, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চপদে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন স্তরে লোকবল নিয়োগ প্রদান, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন কার্যক্রম, দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নানা ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবা প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান ও কার্যাদেশ প্রদান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পছন্দসই স্থানে বদলি এবং পদোন্নতি দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অংকের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক তথ্যে উন্মোচিত হয়েছে।
সংবাদ ব্রিফিংকালে দুদক কর্মকর্তা তানজির আহমেদ সরকারি বিভিন্ন মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক খাত থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বহুমুখী অভিযোগের বিষয়টি সবিস্তারে তুলে ধরে সাংবাদিকদের জানান, সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, গ্রামীণ সড়ক ও সংযোগ সেতু নির্মাণ কাজ, রাজধানী ঢাকার অতি প্রয়োজনীয় সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং দেশব্যাপী পরিচালিত শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের নির্ধারিত সার্বিক ব্যয় অন্যায় ও অনিয়মের মাধ্যমে বহুগুণ বাড়িয়ে বিশাল অংকের সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ কমিশনের সংশ্লিষ্ট ফাইলে যুক্ত হয়েছে।
বিদেশে অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিকভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন চোরাই ও অনৈতিক উপায়ে বিপুল অংকের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পাচার করা এসব বিপুল অর্থ দিয়ে আসিফ মাহমুদ ইউরোপ মহাদেশের পর্তুগাল, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র দুবাই, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নত রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বের শীর্ষ সারির সমৃদ্ধ দেশগুলোতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন এবং বিপুল স্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন। একই সাথে গোপনীয় ব্যাংকিং সুবিধার দেশ সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকেও তাঁর বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখার নির্ভরযোগ্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা ইতোমধ্যে স্বাধীন কমিশন কর্তৃক নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে।
পারিবারিক ও নিকটস্থ প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের ব্যাপক দুর্নীতি এবং অপকর্মের চিত্র তুলে ধরে দুদকের কর্মকর্তা তানজির আহমেদ আরও বলেন, কেবল সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ একা নন, তাঁর নিকটতম স্বজন অর্থাৎ তাঁর বাবা, এপিএস (সহকারী একান্ত সচিব) এবং পিও (ব্যক্তিগত কর্মকর্তা)-র বিরুদ্ধেও সরকারি কেনাকাটা ও ঠিকাদারী সিন্ডিকেট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা, অনৈতিক ঘুষ লেনদেনের প্রত্যক্ষ তদবির পরিচালনা করা এবং অর্পিত সরকারি ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের নানা অভিযোগ কমিশনের তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের উক্ত ব্রিফিংয়ের শেষভাগে জনসংযোগ কর্মকর্তা তানজির আহমেদ আরও স্পষ্ট করে জানান, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত এসব অভিযোগ প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। কমিশন এসব বিষয়ের প্রতিটি তথ্য সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষ ও কঠোর অনুসন্ধানী কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং দেশের অর্থ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।