বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ঢাকার আশুলিয়া থানায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় মোসা. সিমু আক্তার বৃষ্টি ওরফে মিষ্টি সুভাসকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ রোববার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. তাজুল ইসলাম সোহাগ উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ শেষে এ আদেশ প্রদান করেন।
আদালতে শুনানি চলাকালে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তীব্র কান্না ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসামি মিষ্টি সুভাস। তিনি বিচারকের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘এভাবে বারবার নতুন নতুন মিথ্যা মামলায় আমাকে না জড়িয়ে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন। প্রতিনিয়ত এমন মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর চেয়ে মেরে ফেলা অনেক ভালো। এসব মিথ্যা মামলায় আমাকে কি এভাবে দিনের পর দিন সাজা দেওয়া যায়? আমি বর্তমানে ভীষণ অসুস্থ, ঘরে আমার ছোট সন্তান রয়েছে। আমি কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত নই এবং কাউকে মারতেও যাইনি। আমি কোনো ধরনের রাজনীতি করি না। এভাবে পদে পদে মিথ্যা মামলায় ঝুলিয়ে রাখার চেয়ে আমাকে মেরে ফেলা অনেক ভালো।’
আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এদিন দুপুর ১২টার পর আসামিকে কাঠগড়ায় নেওয়ার উদ্দেশ্যে হাজতখানা থেকে বের করা হলে তিনি হঠাৎ তীব্র মাথা ঘুরে নিচে পড়ে যান। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধরে হাজতখানায় ফিরিয়ে নিয়ে প্রাথমিক শুশ্রূষা দেন। পরবর্তী সময়ে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ও সুস্থ বোধ করলে তাঁকে কাঠগড়ায় তোলা হয়।
আদালতে শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসামিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য জোর আবেদন জানান। তিনি যুক্তি তুলে ধরে আদালতকে বলেন, মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অভিযুক্ত আসামি সরাসরি ফ্যাসিবাদী আদর্শের ধারক এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষে মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শক্তি উৎপাদনকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। তাই এই সুনির্দিষ্ট মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থেই আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানো অত্যন্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী গোলাম রাব্বানী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে মিষ্টি সুভাসকে নতুন কোনো মামলায় গ্রেপ্তার না দেখানোর জন্য বিনীত প্রার্থনা জানান। তবে শুনানি শেষে আদালত আসামিপক্ষের যুক্তিসমূহ বিবেচনায় না নিয়ে তাঁকে এই হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার আশুলিয়া থানার বাইপাইল মোড় এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে অংশ নেন কিশোর মো. আবির। সেই সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একদল সশস্ত্র নেতাকর্মী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। তাদের ছোড়া গুলিতে কিশোর আবির গুরুতরভাবে আহত হয়। ওই হামলার ঘটনায় ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর আশুলিয়া থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
এর আগে, গত ২৬ মার্চ বেলা ১টা ১০ মিনিটের দিকে আশুলিয়া থানার নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল বেদির সামনে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২২ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল বের করে স্লোগান দেন। তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসংবলিত বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করেন এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ সরকার মানি না মানব না’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন।
পরবর্তী সময়ে ঘটনাস্থল থেকে দুপুর দেড়টার দিকে দুজনকে পুলিশ আটক করে এবং আশুলিয়া থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়। সেই ঘটনার পর মিষ্টি সুভাসকে পর্যায়ক্রমে চারটি পৃথক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। সম্প্রতি ওই মামলাগুলোতে জামিন পেয়ে তিনি কারামুক্তির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তবে কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ৯ সেপ্টেম্বর এই হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আশুলিয়া থানার এসআই আতোয়ার রহমান। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আদালত ১৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছিলেন।