পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে তহবিল তসরুফের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
মঙ্গলবার বিকেলে গভর্নর কার্যালয়ে পাঁচ ব্যাংকে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেন গভর্নর। বৈঠকে ব্যাংক খাতের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়া, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গভর্নর বলেন, একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম কোনোভাবেই স্থগিত হবে না। ব্যাংকটির এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ তাদের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করার মাধ্যমে কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব ব্যাংকের তহবিল তসরুফের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে কঠোর নজরদারি বজায় থাকবে বলেও তিনি জানান।
বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে যে, পাঁচ ব্যাংকের আওতায় থাকা বিভিন্ন শিল্পকারখানার কার্যক্রম পুনরায় সচল করা প্রয়োজন। গভর্নর নির্দেশ দেন, এসব কারখানার অস্তিত্ব যাচাই করে দ্রুত উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বকেয়া রয়েছে, সেগুলো পরিশোধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈদেশিক দেনা পরিশোধে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়। প্রশাসকদের মাধ্যমে কারখানার আর্থিক অবস্থা ও দায়দেনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত রোববার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) প্রতিনিধিরা সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে গভর্নর একই ধরনের বার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে তিনি নতিস্বীকার করবেন না।
গভর্নর আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নীতি সহায়তা প্রদান করা হবে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো সচল করতে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেওয়া হবে। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
নতুন ব্যাংকটি মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে প্রদান করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীর আমানত সুরক্ষায় আমানত বীমা তহবিল থেকে প্রত্যেককে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা করে পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় মোট প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিপুল সংখ্যক আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষা ও ব্যাংক ব্যবস্থার আস্থা পুনরুদ্ধারই এই একীভূতকরণের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সংকট নিরসনে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূত ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, দক্ষ প্রশাসন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক তদারকি ও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতে সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। একীভূতকরণ কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন নয়, বরং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একটি অংশ। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে শক্ত অবস্থান নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।