গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। চলমান এই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আশপাশের অঞ্চল ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও এর গভীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইসরাইল ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়, তবে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ইসরাইলের প্রভাব তাফতান সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান অঞ্চল এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর এর অস্থিতিশীল প্রভাব পড়তে পারে।
পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। দেশটির আশপাশের নিরাপত্তা পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এ অবস্থায় পাকিস্তানের কৌশলগত পুনঃসংযোজন প্রয়োজন।
পাকিস্তানের কৌশলগত পুনঃসংযোজনের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, দেশকে অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করা। বিরোধী দলের প্রতি উদার মনোভাব প্রদর্শন, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং বেলুচিস্তানের নিখোঁজদের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কাবুল-দিল্লি সংযোগের আলোকে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি শান্ত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, কার্যকর প্রতিরক্ষা ও সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল প্রণয়ন জরুরি। বহুমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রয়োজন, যাতে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে না পড়ে।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আরও বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য এখন আর সীমিত পরিসরের সংঘাতে আবদ্ধ নেই। যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সাইপ্রাস পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই সংঘাত ধীরে ধীরে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পূর্বেই সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল ইরানকে আক্রমণ করলে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়; বরং এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তথ্যসূত্র: জিওনিউজ