আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং অন্যান্য অঞ্চলে ইসরায়েলি হামলার মধ্যেই একটি পরিবার যেন গাজার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাহামুদ তকি নামে এক লেবানিজ বাবা একসঙ্গে চার সন্তান—জয়নব, জাহরা, মালেকা ও ইয়াসমিন—হারিয়েছেন। তিনি আর্তনাদ করে বলেছেন, ‘ওরাই ছিল আমার সব।’ এই চার মেয়ের পাশাপাশি তিনি মা, বাবা, শ্যালক এবং ভাগ্নেকেও হারিয়েছেন।
ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে গত সোমবার পর্যন্ত ইসরায়েলের হামলায় কমপক্ষে ৭৭০ জন নিহত হয়েছে। হামলার ফলে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মাহামুদ তকি আল জাদিদ টিভিকে বলেন, ‘আমি আমার চার মেয়ে এবং বাবা-মাকে হারিয়েছি। আমি নিজেও আহত হয়েছি। মুখ এবং মাথায় আঘাত পেয়েছি।’ শুক্রবার তার বাবা-মা, চার মেয়ে এবং অন্যান্য আত্মীয়দের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলি শত্রুরা বলছে তারা অবকাঠামো লক্ষ্য করছে। এটা কি অবকাঠামো?’ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় একই ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতি বারবার ঘটছে। শুক্রবারও এক মা ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত পাঁচ ছেলেকে কবর দিয়েছেন। এই সপ্তাহের শুরুতে বৈরুতের মধ্যাঞ্চলের ঘোবেইরি পাড়ায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হামদান পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে বাবা আহমেদ হামদান, তার তিন মেয়ে এবং দুই নাতি-নাতনিও নিহত হন। হামদানের স্ত্রী কয়েক দিন নিখোঁজ ছিলেন।
গাজার মতো পরিস্থিতি লেবাননে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলমান ইসরায়েলি হামলার সময় ২ হাজার ৭০০টিরও বেশি পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং প্রায় ৬ হাজার পরিবারের মধ্যে মাত্র একজন করে বেঁচে আছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লেবাননের অনেক পুরো পরিবারও নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ম্যারোনাইট খ্রিস্টান গ্রাম আইতোতে ইসরায়েলি হামলায় চার প্রজন্মের ২২ জন নিহত হয়েছিল। তাদের বয়স ছিল ৪ মাসের শিশু থেকে ৯৫ বছর পর্যন্ত।
ইসরায়েলের হামলা ও বাস্তুচ্যুতি কমাতে ৮ লাখের বেশি লেবানিজকে জোরপূর্বক সরানো হয়েছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) লেবাননের সমন্বয়কারী লু করম্যাক বলেছেন, ‘গাজায় যা দেখেছি তার সঙ্গে লেবাননেও মিল। ব্যাপক স্থানান্তর, হাজার হাজার পরিবারের ক্রমাগত স্থানচ্যুতি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমা হামলা। ১৫ মাস ধরে যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হয়েছে। পরিবারগুলো আবারও পালিয়ে যাওয়া বা বোমার মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে আটকা।’
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা হিজবুল্লাহর রকেট এবং অন্যান্য হামলা বন্ধ করতে লেবাননে আক্রমণ করছে। সাংবাদিক লিলা ইউনেস জানান, ‘গণহত্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ বেকা উপত্যকায় ৭ জন নিহত, নবী চিতে বিশাল গণহত্যা। এছাড়া সিরিয়ান শরণার্থীদের ওপরও হামলা ঘটেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের বুর্জ কালাওয়েতে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলায় ১২ জন চিকিৎসক নিহত হয়েছেন। ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে লেবাননে ৭৭৩ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১০৩ জন শিশু। ২০২৩-২৫ সাল পর্যন্ত লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলায় ১ হাজার ৩০০ এর বেশি বেসামরিক নিহত ও ১০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। ২০০ এর বেশি নারী ও শিশু নিহত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাবে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ এর বেশি ইরানি নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই শিশু।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজারের বেশি ইরানি নিহত হন। পাল্টা হামলায় ইসরায়েলে ২৮ জন নিহত। গাজায় ইসরায়েল ২৮ মাস ধরে গণহত্যা চালাচ্ছে। ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত, নিখোঁজ বা পঙ্গু। প্রায় ২০ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের ফলে ৯ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে চার লাখ বেসামরিক।
লেবাননের ধ্বংসস্তূপে পরিণত পরিবারগুলোর কাহিনী হৃদয়বিদারক। একজন কিশোরী বলেন, ‘ইসরায়েলি জেট বিমান বোমাবর্ষণ করলে আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার বাবা, মা, ননদ ও তার সন্তানরা নিহত হয়েছেন। আমি যদি আমার বাবাকে এভাবে দেখার পরিবর্তে মারা যেতাম, তা ভালো হতো।’
আকাশজমিন / আরআর