মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরানে পৌঁছানো হয়েছে। এতে পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ এবং পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে উভয় পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের কথাও বলা হয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সৈয়দ আসিম মুনির এই উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন। ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সক্রিয় রয়েছে। উভয় পক্ষ সম্মত হলে পাকিস্তান সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতেও প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে তাদের “খুব ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে সরাসরি অস্বীকার করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মাধ্যমে কিছু বার্তা পেয়েছেন বটে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি। ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই যেকোনো আলোচনায় অংশ নেওয়া সম্ভব।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সামরিক উত্তেজনা এখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। বিমান হামলা, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্টাপাল্টি ব্যবহারে উভয় পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বৈশ্বিক তেলের বাজারেও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ হওয়ায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো ১৫ দফার প্রস্তাব কূটনৈতিকভাবে একটি সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। তবে বাস্তবে এই প্রস্তাব কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে ইরানের অবস্থান, ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এবং চলমান সামরিক পরিস্থিতির ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ চলমান অবস্থায়ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়া ইতিবাচক ইঙ্গিত। কিন্তু আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক স্বার্থের জটিলতার কারণে দ্রুত সমাধান পাওয়া সহজ হবে না।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার হলেও পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মহল আশা করছে, আলোচনার পথ আরও প্রসারিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সূত্র: আনাদোলু
আকাশজমিন / আরআর