ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে চালকবিহীন ‘ড্রোন স্পিডবোট’ বা স্বয়ংক্রিয় নৌযান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এটি প্রথমবারের মতো যখন যুক্তরাষ্ট্র কোনো সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই ধরনের ড্রোন নৌযান ব্যবহারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করল। এর আগে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ড্রোন বোটগুলো মূলত নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হলেও প্রয়োজনে আত্মঘাতী হামলাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে এগুলোকে আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চালকবিহীন এই নৌযানগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে দীর্ঘ সময় পানিতে ভেসে থাকতে পারে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। উন্নত সেন্সর, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ন্যাভিগেশন সিস্টেমের মাধ্যমে এগুলো দূরবর্তী স্থান থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গত বছর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চালকবিহীন নৌবহর তৈরির ক্ষেত্রে মার্কিন নৌবাহিনী বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। তবে এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে এখন এই প্রযুক্তিকে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার শুরু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আকাশে ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি এখন সমুদ্রেও চালকবিহীন নৌযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধে বিস্ফোরকবাহী স্পিডবোট ব্যবহার করে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের ব্যাপক ক্ষতি করার পর থেকেই এই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এরপর বিভিন্ন দেশ এই ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
প্রায় এক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর থেকে ইরানও অন্তত দুইবার পারস্য উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার জন্য ‘সি ড্রোন’ ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। ফলে সমুদ্রভিত্তিক ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এই ড্রোন বোট ব্যবহার করে কোনো সরাসরি আক্রমণাত্মক হামলা চালিয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মুখপাত্র টিম হকিন্স জানিয়েছেন, মেরিল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাক-সি’র তৈরি এসব চালকবিহীন নৌযান ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে টহল দিচ্ছে।
এই নৌযানগুলো ‘গ্লোবাল অটোনোমাস রিকনেসান্স ক্রাফট’ বা ‘জিএআরসি’ নামে পরিচিত। এগুলো দীর্ঘ সময় পানিতে থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নজরদারি চালাতে সক্ষম।
এক বিবৃতিতে টিম হকিন্স বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে জিএআরসি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে মার্কিন বাহিনী। এই নৌযানগুলো ইতোমধ্যে ৪৫০ ঘণ্টারও বেশি সময় পানিতে ভেসে থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ অতিক্রম করেছে।
তবে বর্তমানে মোতায়েন থাকা অন্য কোনো ড্রোন ব্যবস্থার নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি। এ বিষয়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ব্ল্যাক-সি’ও কোনো মন্তব্য করতে চায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। এতে মানবসম্পৃক্ততা কমে গেলেও ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা নতুনভাবে তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন প্রযুক্তি মোতায়েন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স