মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬ জনে। আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার মানুষ। রোববার (২৯ মার্চ ২০২৬) ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত আহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭৬৭ জন শিশু রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অনেক শিশুই গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং তাদের সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বেসামরিক নাগরিকদের পাশাপাশি অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, হামলার কারণে দেশের অন্তত ৩৩৬টি স্বাস্থ্য ও জরুরি সেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবাও রয়েছে। ফলে আহতদের চিকিৎসা প্রদান আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর ওপর এই ধরনের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কারণ এতে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শয্যার সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, অনেক এলাকায় আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার আগেই চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আবার কোথাও কোথাও হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প স্থানে অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বেসামরিক জনগণ ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বিপুলসংখ্যক হতাহত এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শিশুদের ওপর হামলার প্রভাব নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ট্রমাও শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মহল থেকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও এখনো সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইরানের বিভিন্ন শহরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। এতে করে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আহতদের দ্রুত চিকিৎসা প্রদান এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ইরানে চলমান হামলায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে এটি আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা
আকাশজমিন / আরআর