যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগ্রাসী অভিবাসনবিরোধী নীতি, ইরানসংক্রান্ত অবস্থানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার (২৮ মার্চ ২০২৬) দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
এই বিক্ষোভ ‘নো কিংস’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। একই নামে এটি তৃতীয়বারের মতো আয়োজিত হলো। আয়োজকদের দাবি, এবারের কর্মসূচিতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে ৩ হাজার ২০০টিরও বেশি স্থানে এই বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিউইয়র্ক, টেক্সাসের ডালাস, পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে সবচেয়ে বড় সমাবেশগুলো অনুষ্ঠিত হয়। তবে আয়োজকদের মতে, অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ ছোট শহর ও উপশহরগুলোতে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন, যা এই আন্দোলনের বিস্তৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তারা জানিয়েছেন, গত বছরের জুনে প্রথমবার আয়োজিত ‘নো কিংস’ বিক্ষোভের তুলনায় ছোট শহরগুলোতে অংশগ্রহণ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্দোলনটি কেবল বড় শহরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেন্ট পলের বাইরে একটি বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন। অনেকের পোস্টারে রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ছবি দেখা যায়, যাদের মিনিয়াপলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা গুলি করে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সমাবেশে বক্তব্য দেন মিনেসোটার গভর্নর Tim Walz। তিনি বলেন, “ট্রাম্প ও তাঁর নীতির বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ হচ্ছে, সেটিই প্রমাণ করে—গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা মানুষেরাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের কট্টরপন্থী বলা হয়। কিন্তু আমরা মানবিকতা, শালীনতা, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব, আমরা তা করব।”
ভারমন্টের সিনেটর Bernie Sanders-ও এই বিক্ষোভে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আমরা এই দেশকে স্বৈরাচার বা অলিগার্কদের হাতে ছেড়ে দেব না। এখানে জনগণের শাসনই বজায় থাকবে।”
নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে প্রায় লাখো মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই সমাবেশের অন্যতম আয়োজক ছিলেন হলিউড অভিনেতা Robert De Niro।
রবার্ট ডি নিরো বলেন, “ট্রাম্পের আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে এতটা সংকটের মুখে ফেলেননি।” তাঁর এই বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এদিকে ৫৪ বছর বয়সী হলি বেমিস বলেন, তারা সেই একই চেতনায় প্রতিবাদ করছেন, যেভাবে তাঁদের পূর্বপুরুষরা আমেরিকান বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, “আমরা রাজাদের শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি এবং স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। এখন আবারও সেই একই লড়াই করছি।”
ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মলেও হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। সেখানে তারা গণতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দেন এবং ট্রাম্পবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।
মেরিল্যান্ডে একদল বয়স্ক মানুষ হুইলচেয়ারে বসে প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানান। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—“স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন”, “গণতন্ত্র চাইলে আওয়াজ তুলুন” এবং “ট্রাম্পকে বিদায় দিন।”
ডালাসে অনুষ্ঠিত সমাবেশেও কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। সেখানে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে বিপরীত মতের কিছু গোষ্ঠীর সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে পরিস্থিতি কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভে অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত টেরেসা গানের। তিনি বলেন, “স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও লোভের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সবার দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প যা করছেন, তা মূলত নিজের সম্পদ বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, একটি ফেডারেল ভবনের সামনে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হলে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের আশপাশ থেকে সরে না যাওয়ার কারণে একাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
কিছু এলাকায় বিক্ষোভকারীরা ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র, অভিবাসননীতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর বিভাজনের প্রতিফলন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের বৃহৎ বিক্ষোভ ভবিষ্যতে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন জনমত সরকার ও বিরোধী পক্ষের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর