আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালির বড় অংশ বন্ধ থাকলেও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত—এমন ইঙ্গিত তিনি মিত্রদের কাছে দিয়েছেন। একই সময় শি জিনপিং–এর নেতৃত্বে চীন ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর বরাতে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রণালিটি পুনরায় চালু করতে যে সময়সীমা ধরা হয়েছিল—চার থেকে ছয় সপ্তাহ—তা আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে প্রথম ধাপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও নৌবাহিনীকে দুর্বল করার ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
এই অবস্থার পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক উত্তেজনা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ‘গ্যাসবাডি’–এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের দাম তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার ট্রাম্প দাবি করেন, সংঘাত শেষ করার আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত কোনো সমাধান না এলে এবং হরমুজ প্রণালি যদি বাণিজ্যের জন্য খুলে দেওয়া না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলক্ষেত্র এবং খার্গ দ্বীপ ধ্বংস করার মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্র গত এক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সামরিক প্রস্তুতি মূলত ইরানকে চাপের মধ্যে রেখে মার্কিন শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করার কৌশল হতে পারে।
তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সহজ হচ্ছে না। নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্বের ওপর ধারাবাহিক হামলার কারণে তেহরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার সমন্বয় করার সক্ষমতাও কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীন এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার–এর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বেইজিং সফরে গেছে। সেখানে চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই–এর সঙ্গে বৈঠকে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং জানিয়েছেন, চীন ও পাকিস্তান ‘সব সময়ের’ কৌশলগত অংশীদার। তারা ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখবে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন উদ্যোগ নেবে।
এর আগে সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে ইশহাক দারের এই সফর শুরু হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত নিরসনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলো সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
চীন ইরানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হলেও এখন পর্যন্ত তেহরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি। বরং বেইজিং বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নতুন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন দেখার বিষয়, যুদ্ধ শেষের দিকে এগোয়, নাকি আরও বড় সংঘাতে রূপ নেয়।