আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবে এক হাজার বছরের পুরোনো একটি বিরল কুরআন বিষয়ক পাণ্ডুলিপি উন্মোচন করা হয়েছে। দেশটির কিং আবদুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরি সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশ্যে এনেছে, যা ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও কুরআনিক গবেষণার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, “গারিব আল কুরআন” শিরোনামের এই পাণ্ডুলিপিটি প্রাচীন মুসলিম পণ্ডিত আবু উবাইদাহ মামার ইবনে আল মুথান্না রচিত। কুরআনের জটিল বা দুর্বোধ্য শব্দের ব্যাখ্যা ও ভাষাগত বিশ্লেষণ নিয়ে এই গ্রন্থটি প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বুধবার (১ এপ্রিল) গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাণ্ডুলিপিটি ইসলামি ইতিহাসের চতুর্থ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এটি মোট ২৩টি পাতা নিয়ে গঠিত এবং প্রতিটি পাতার মাপ প্রায় ১৭ বাই ২২ সেন্টিমিটার। পাণ্ডুলিপিতে ব্যবহৃত হয়েছে সুস্পষ্ট আন্দালুসীয় লিপি, যা মধ্যযুগীয় ইসলামি সভ্যতার একটি স্বতন্ত্র লিখনশৈলী হিসেবে পরিচিত।
এতে সূরার নামগুলো কুফিক লিপিতে লেখা হয়েছে, যা ইসলামি ক্যালিগ্রাফির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি ধরন। কুরআনের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও নকল করার ক্ষেত্রে কুফিক লিপির ব্যবহার একসময় ব্যাপক ছিল। এ কারণে এই পাণ্ডুলিপিটি শুধু ধর্মীয় নয়, বরং শিল্প ও সংস্কৃতির দিক থেকেও অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “গারিব আল কুরআন” গ্রন্থটি কুরআনিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলেও এখন পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি। ফলে এর পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ও বিশ্লেষণের সুযোগ এখনও সীমিত। পাণ্ডুলিপিটি উন্মোচনের মাধ্যমে গবেষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিং আবদুল আজিজ পাবলিক লাইব্রেরি জানিয়েছে, তাদের সংগ্রহে কুরআনের তাফসির, ভাষাতত্ত্ব এবং ইসলামি জ্ঞানচর্চা সম্পর্কিত বিভিন্ন শতাব্দীর বহু বিরল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে আবু ইসহাক আল-জাজ্জাজ এবং ইবনে কুতাইবাহ আল-দিনাওয়ারির রচনাসমূহ উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া ষষ্ঠ শতকে নকল করা তাফসির আল-তাবারির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশও এই লাইব্রেরির সংগ্রহে রয়েছে। এসব পাণ্ডুলিপি ইসলামি জ্ঞান ও ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
লাইব্রেরির আর্কাইভে কুরআনের ব্যাখ্যা বিষয়ক ১৮৫টিরও বেশি বিরল পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে। এর পাশাপাশি কিরাত, ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব এবং ব্যাখ্যা বিষয়ক শত শত গ্রন্থও এই সংগ্রহশালার অংশ। ফলে এটি ইসলামি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য হলো এসব বিরল পাণ্ডুলিপি, নথি, আলোকচিত্র, মুদ্রা এবং প্রত্নবস্তুকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। এর মাধ্যমে ইসলামি ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক রূপ তুলে ধরার পাশাপাশি গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
তারা আরও জানিয়েছে, গবেষকদের জন্য এসব মূল্যবান পাণ্ডুলিপি আরও সহজলভ্য করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব ঐতিহাসিক নথির ডিজিটাল সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এক হাজার বছরের পুরোনো এই পাণ্ডুলিপি উন্মোচন ইসলামি ইতিহাস ও কুরআন গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং বিশ্বজুড়ে গবেষকদের আগ্রহ আরও বাড়াবে।