ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

বিশ্বব্যাপী তেল–সংকট আরও মারাত্মক হওয়ার আশঙ্কা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০২ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৭:৪২ পিএম

১৯৭০–এর দশকের তেল–সংকটের কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকেও মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার ইতিমধ্যে জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। ফিলিপাইন তেল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কারণে বিদ্যালয়ে অনলাইন ও সশরীরে ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন শহরে বাসাবাড়ি ও রেস্তোরাঁয় গ্যাসের অভাবে কাঠের আগুনে রান্না হচ্ছে, আর এয়ারলাইনসগুলো তাদের উড়ান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে সৃষ্টি হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রাথমিক ধাক্কা যত কঠিনই হোক, সামনে আসা পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হতে পারে। হরমুজ প্রণালীর আগে যেসব তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) চালান এশিয়ার পথে রওনা হয়েছিল, সেগুলো শিগগিরই পৌঁছাবে। ইউরোপগামী শেষ ট্যাংকার চালানগুলো এপ্রিলের মাঝামাঝি পৌঁছাবে। এরপর বিশ্বের বহু দেশের পেট্রল, ডিজেল, এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর প্রধান ফাতিহ বিরল বলেছেন, এবারের সংকট ইতিহাসের সবচেয়ে বড়; জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি এর আগে কখনো এত প্রকট হয়নি। ১৯৭০–এর দশকের তেল–সংকটের চেয়ে বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ। কোভিড মহামারির সময় তেমন সমস্যা দেখা যায়নি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের চেয়ে এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। যুদ্ধের পরিসর ব্যাপক হওয়ায় তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত এই ঘাটতি পূরণের উপায় নেই।

এদিকে, গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো আরও বেশি কয়লা ব্যবহার করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এশিয়া ও ইউরোপে সৌর প্যানেল, বায়ুচালিত টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এসব বিকল্প জ্বালানি বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী।

জ্বালানির সরবরাহ সংকটে ভোক্তারা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত হচ্ছেন। ২৪ মার্চ ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ম্যানিলার গাড়ি ক্রেতারা চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি ‘বিওয়াইডি’-র বিক্রয়কেন্দ্রে ভিড় করেছেন। জার্মানিতে সৌর পণ্য বিক্রেতারা উল্লেখ করেছেন, গ্রাহকদের আগ্রহ হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটেনে হিট পাম্প স্থাপনের চাহিদা বাড়ছে। পাকিস্তানে বৈদ্যুতিক রিকশার বিক্রি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতে অনলাইন বিক্রেতাদের ইনডাকশন কুকটপের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।


ভিয়েতনামের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করতে চায়। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি সঞ্চয় প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীনের তিনটি বড় ব্যাটারি কোম্পানির বাজারমূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশদের জন্য শিক্ষণীয়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পাকিস্তান বড় ধাক্কা খেয়েছিল। হঠাৎ গ্যাস আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা অনেক চালান পাচ্ছিল না। কিন্তু চীনের সস্তা সৌর প্যানেল দেশটির জ্বালানিব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সৌরশক্তি থেকে আসে, যা ২০২০ সালে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার-এর বিশ্লেষক লাউরি মিলিভির্তা বলেছেন, সৌরশক্তি ব্যবহার করে কয়েক বছরের মধ্যেই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। তেল ও গ্যাস সরবরাহ যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরাতে কয়েক বছর লাগতে পারে।

কাতারের রাস লাফান এলএনজি রপ্তানি স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর এলএনজির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজার থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ কমে গেছে। আরব অঞ্চলের অন্যান্য উৎপাদকও তেল ও গ্যাসের উৎপাদন কমিয়েছে। সংরক্ষণাগারগুলো সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় চালু করা যায় না; উৎপাদন আবার বাড়াতে মাসের পর মাস সময় লাগবে। বিকল্প জ্বালানি খুঁজে পাওয়ার চাপ বাড়ছে।

এই যুদ্ধ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধির কারণে নতুন জ্বালানি স্থাপনা ও গ্রিড প্রকল্পে অর্থায়ন কঠিন হচ্ছে। ট্রান্সফরমার, অ্যালুমিনিয়াম, তামার তারের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি স্থাপনা নির্মাণে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

ভারতের মতো দেশগুলোকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎব্যবস্থা থেকে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের দিকে দ্রুত পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারকে ঠিক করতে হবে, তারা সৌর প্যানেল, হিট পাম্প ও বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানায় কতটা বিনিয়োগ করবে। আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক নির্ধারণও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানির স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে আরও বেশি বায়ু, সৌরশক্তি ও ব্যাটারি ব্যবহার করা জরুরি। গৃহের তাপব্যবস্থা ও পরিবহন খাত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল করলে কার্বন নিঃসরণও কমবে।

চীন এই পথে সবচেয়ে এগিয়েছে। গত এক দশকে তারা পরিবহন ও শিল্প খাতের বড় অংশ বিদ্যুতায়ন করেছে। দৈনিক তেল ব্যবহার ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি কমিয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে ২২৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাস দেখিয়েছে, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যৎ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও বিদ্যুৎভিত্তিক। মার্কিন ভোক্তারা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও হিট পাম্পের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর