মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। সাম্প্রতিক কয়েকদিনে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছে সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড। সংস্থাটি বলছে, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে জাহাজগুলো এই পথ ব্যবহার করছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উইন্ডওয়ার্ড জানায়, গত বুধবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ১৬টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর ফলে টানা তিনদিন ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। যদিও এই সংখ্যা এখনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম, তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির তুলনায় এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন হরমুজ দিয়ে যাওয়া ১৬টি জাহাজই ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেছে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো নিরাপদে পারাপারের জন্য ইরানের সঙ্গে পূর্ব আলোচনা সম্পন্ন করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, আঞ্চলিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক স্বার্থে দেশগুলো বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
উইন্ডওয়ার্ড আরও জানায়, ওই জাহাজগুলো লারাক দ্বীপের রুট ব্যবহার করেছে। এই রুটটি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রুট ব্যবহার বাড়ার অর্থ হলো বিভিন্ন দেশ ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। এখানে অচলাবস্থা তৈরি হলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। সেই তুলনায় বর্তমান সংখ্যা অনেক কম, যা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাকেই তুলে ধরে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এই রুটের গুরুত্ব অপরিসীম। উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎপাদিত জ্বালানির বড় অংশই এই পথ দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে থাকে।
এদিকে ইরান শুরু থেকেই জানিয়ে আসছে, তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে। তবে তারা স্পষ্ট করেছে, ‘ইরানের শত্রু ও তাদের মিত্রদের’ জাহাজ এই সুবিধার বাইরে থাকবে। অন্য দেশগুলোকে টোল পরিশোধ এবং পূর্ব অনুমতির মাধ্যমে এই রুট ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এই অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসছে, যাতে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিকল্প রুট খোঁজার চেষ্টা বাড়বে, তবে তা সহজ নয়। কারণ হরমুজ প্রণালির মতো সুবিধাজনক ও কার্যকর পথ খুব কমই রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাড়ার এই প্রবণতা কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও, এটি এখনো স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমে না এলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।